প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি ভারত সফরে যাচ্ছেন? আলোচনা চললেও স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না কোনো তরফেই। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানালেন, দুই দেশের মধ্যে আস্থা ফিরলে তবেই দিল্লি যাবেন তারেক রহমান।
বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হতে পারে।
তারেক রহমান ভারত সফরে যাচ্ছেন— ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্ট করেন, ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
উপদেষ্টার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের (আন্তর্জাতিক) দায়িত্বে থাকা হুমায়ুন কবিরের এই সাক্ষারকার নেওয়া হয়েছিল গত ১৭ আগস্ট, তা আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশে দুই বছর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ঠেকেছিল তলানিতে। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সম্পর্কোন্নয়নের লক্ষণ দেখা গেলেও ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার দিল্লিতে থেকে সংবাদ সম্মেলন নতুন করে জটিলতা তৈরি করে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ রয়েছে ভারতের। পাশাপাশি আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও রয়েছে।
হুমায়ুন কবির বললেন, ‘আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে কোনো তাড়াহুড়ো না করার নীতি গ্রহণ করেছে।’
‘তবে দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়ে ঢাকা ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করবে,’ যোগ করেন তিনি।
‘অনুকূল পরিবেশ’ কীভাবে তৈরি হতে পারে, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু তিনি বলেননি। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত শেখ হাসিনা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হত্যাকাণ্ডের আসামিদের ফেরত পাঠাতে হবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের মাইন্ডসেট (মানসিকতা) বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতাকে প্রতিবেশী দেশকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে।’
বাংলাদেশে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চায়, তা নিশ্চিত হতে চাইছে ঢাকা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলছেন, ‘জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে শীর্ষ সফর করার কোনো যুক্তি নেই। সুনির্দিষ্ট বিষয়ে উভয় দেশের ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া ছাড়া আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ।’
শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ
বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো এবং প্রচারমাধ্যমে সুযোগ করে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অপরাধী হিসেবে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া, ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে সেখানে রাজনৈতিক কিংবা মিডিয়াতে কথা বলার সুযোগ দেওয়া ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থী।
‘ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানো কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, সন্ত্রাসী বা খুনিকে স্পেস দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী দিল্লি এটিকে কোনোভাবেই যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারে না। সেইসাথে তা কোনো অবস্থাতেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অজুহাতে জাস্টিফাই করা যায় না।’
এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকার ইতোমধ্যে নয়া দিল্লিকে প্রতিবাদ জানিয়েছে বলেও জানান হুমায়ুন কবির।
ভারতে থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দলীয় নানা কার্যক্রমে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ নিয়ে ঢাকার অসন্তোষের প্রতিক্রিয়ায় দিল্লি বলে আসছে, এ ক্ষেত্রে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি
বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করে চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
তার ভাষ্যে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্র নীতি বজায় রাখছে বর্তমান সরকার। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্কে যুক্ত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করেই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।’
উপদেষ্টা জানান, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রিয়াদ সফর চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি খাতের সঙ্গে সয়াবিন আমদানি ও বোয়িং বিমান কেনার আলোচনা এগোনোর পাশাপাশি বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা রয়েছে। পাশাপাশি ইইউর সঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের সুনির্দিষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে।
চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক এখন এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে চীনের সাথে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় বাংলাদেশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।