Image description

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি থ্রিজি থেকে দ্রুত ফোরজি এবং এখন ফাইভজির দিকে এগিয়ে গেলেও, গত এক দশক ধরে মোবাইল ব্যবহারকারীদের ভোগান্তি তেমন বদলায়নি।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রথম গণশুনানিতে কল ড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট, দুর্বল নেটওয়ার্ক কাভারেজ, উচ্চ শুল্ক এবং সিম-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোই যেমন প্রধান অভিযোগ ছিল, বুধবার অনুষ্ঠিত সপ্তম গণশুনানিতেও সেগুলোই আবার বড় অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে।

ডিজিটাল সম্প্রসারণের সঙ্গে নতুন কিছু সমস্যাও যুক্ত হয়েছে—যেমন ডেটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর), ওটিটি-সংযুক্ত প্যাকেজ, বিদেশি ওটিপি পেতে দেরি এবং এসএমএস মাস্কিং। তবে, ভোক্তারা এখনো দাম, গতি, কাভারেজ এবং সেবার মান সংক্রান্ত মূল সমস্যাগুলো নিয়ে ভুগছেন।

তবে সর্বশেষ গণশুনানিতে একটি সম্ভাব্য স্বস্তির খবর এসেছে। বিটিআরসি জানিয়েছে, প্রতি মিনিটে ৪৫ পয়সা হিসেবে বর্তমানে নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভয়েস কলের মূল্য, পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।

একজন ভোক্তার কলের দাম কমানোর দাবির জবাবে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহজাদ পারভেজ মাহমুদ্দিন বলেন, ‘ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস কমানোর কাজ চলছে।’

বর্তমানে বিটিআরসি নির্ধারিত ভয়েস কলের মূল্য প্রতি মিনিটে ৪৫ পয়সা থেকে ২ টাকা পর্যন্ত।

বিটিআরসির সাতটি গণশুনানি দেখিয়েছে, টেলিযোগাযোগ খাতে ভোক্তাদের অভিযোগ কতটা দীর্ঘস্থায়ী।

২০১৬ সালের প্রথম গণশুনানিতে এক হাজার ৫০টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে প্রধান ছিল কল ড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট এবং বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন। ২০২১ সালের অনলাইন গণশুনানিতে অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড দাঁড়ায় ২৩ হাজার ১৬-তে। এরপর ২০২২ সালে ৮৪৮টি এবং ২০২৪ সালে তিন হাজার ২৫টি অভিযোগ পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের গণশুনানিতে সেবার মান, উচ্চ মূল্য, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে ভোক্তারা এক হাজার ৭৫৬টি প্রশ্ন, মতামত ও অভিযোগ করেন।

বুধবারের গণশুনানিতে অনলাইনে দুই হাজার ৯৯০ জন ভোক্তা নিবন্ধন করেন। সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৪৫টি অভিযোগ জমা পড়ে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগে। এরপর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগে ৮৪৪টি অভিযোগ জমা পড়ে।

ট্যারিফ, ডেটার মেয়াদ ও ক্যারি-ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধন, এনইআইআর এবং সেবার মান ছিল এক্ষেত্রে প্রধান উদ্বেগের বিষয়।

এদিকে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিটিআরসির কাছে মোট ১৩ হাজার নয়টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৫১টি এসেছে হেল্পলাইনের মাধ্যমে এবং সাত হাজার ৯৫৮টি এসেছে ওয়েববক্সের মাধ্যমে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, এর মধ্যে ১১ হাজার ২৭৯টি অভিযোগ বা ৮৬ দশমিক ৭০ শতাংশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

তবে, সবসময় অভিযোগ নিষ্পত্তির হার থেকে ভোক্তারা কত দ্রুত সমাধান পান, তা প্রতিফলিত হয় না। বিটিআরসি জানিয়েছে, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত অভিযোগের সমাধান করতে বেশি সময় লাগে, কারণ এর জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন।

ঢাকার এয়ারটেল গ্রাহক রুবাইদ ইফতেখার টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, নেটওয়ার্কের সমস্যা নিয়ে তিনি ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট এয়ারটেলের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তার দাবি, অপারেটরটি প্রায় তিন বছর পর, ২০২৬ সালের ২ জুলাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং জানায় যে, সমস্যাটি সমাধান করা সম্ভব নয়।

দীর্ঘমেয়াদি অভিযোগের তথ্যও অসন্তোষের ব্যাপকতা তুলে ধরে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিটিআরসি দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে মোট ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ পেয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ২৪ হাজার ৮৭৪টি অভিযোগ ছিল রবির বিরুদ্ধে। এ ছাড়া গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ২১ হাজার ৫২৬টি, টেলিটকের বিরুদ্ধে ১১ হাজার ৫৯৪টি এবং বাংলালিংকের বিরুদ্ধে আট হাজার ৭১১টি অভিযোগ জমা পড়ে।

এর মধ্যে প্রধান অভিযোগগুলো ছিল সেবার মান, ইন্টারনেটের গতি ও ভ্যালু-অ্যাডেড সার্ভিস, পাশাপাশি মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি, রিচার্জ ও বিলিং, সিম নিবন্ধন, শুল্ক, সিমের মালিকানা এবং প্রতারণা। অপারেটরগুলো বেশিরভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তি করার দাবি করলেও একই ধরনের সমস্যা বারবার বিটিআরসির গণশুনানিতে ফিরে আসছে।

কম শুল্কের বিষয়টি এখনো ভোক্তাদের অন্যতম প্রধান দাবি। জামালপুরের এক ভোক্তা রাকিব রায়হান বিটিআরসির কাছে কলের দাম কমানো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের গ্রামীণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়ে জানতে চান।

এর জবাবে বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আলম পারভেজ বলেন, ‘টেলিটক দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বাধ্যবাধকতা পূরণে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে হাওর এলাকা ও অন্যান্য দুর্গম অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়টিও রয়েছে।

ভোক্তারা আরও অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় মোবাইল নেটওয়ার্কও অচল হয়ে পড়ে। এতে ব্যাকআপ অবকাঠামো ও নেটওয়ার্ক কাভারেজের দুর্বলতা প্রকাশ পায়।

বিটিআরসি জানিয়েছে, টাওয়ারগুলো কখন এবং কোথায় সচল বা অচল রয়েছে তা শনাক্ত করার জন্য তারা একটি নেটওয়ার্ক মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে অপারেটরদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হবে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলছে, অবকাঠামোর ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫৬ হাজার মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার রয়েছে, যেখানে আনুমানিক প্রয়োজন ৭০ হাজারের বেশি। সেবার মান উন্নত করতে নতুন টাওয়ার স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান টাওয়ারের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

ডেটা প্যাকেজও ভোক্তাদের জন্য আরেকটি ভোগান্তির কারণ, বিশেষ করে ডেটার মেয়াদ, ক্যারি-ফরওয়ার্ড সুবিধা এবং ওটিটি-সংযুক্ত অফার বিষয়ক নানান ভোগান্তি।

বিটিআরসি জানিয়েছে, একই প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তা পুনরায় চালু বা নবায়ন করলে অব্যবহৃত ডেটা ক্যারি-ফরওয়ার্ড করা যাবে। অপারেটরদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে গ্রাহকদের জানাতে এবং প্যাকেজের সুবিধা, শর্ত ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নতুন কিছু ডিজিটাল সমস্যাও সামনে এসেছে। গাজীপুরের এক ভোক্তা আনমাস্কড এসএমএস নিয়ে অভিযোগ করেন। এর ফলে আসল বার্তা ও স্প্যাম বার্তার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিদেশি ওটিপি পেতেও দেরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিটিআরসি জানিয়েছে, সব এসএমএস ধীরে ধীরে মাস্কিং ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। আর ওটিপি পেতে দেরির কারণ হিসেবে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক জটিলতা থাকতে পারে। ব্যবহারকারীরা মধ্যে এনইআইআর-সংক্রান্ত অভিযোগও বেশি করছেন।

মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণ নিয়েও গণশুনানিতে প্রশ্ন ওঠে। বিটিআরসি জানিয়েছে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড (ইএমএফ) বিকিরণের মাত্রা নিয়মিত পরিমাপ করা হয় এবং এই মাত্রা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সীমার অনেক নিচে রয়েছে। ফলে এটি জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে না।

বহু বছর ধরে সেবার মান নিয়ে অভিযোগের পর বিটিআরসি এখন আরও স্বচ্ছতার দিকে এগোচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) নির্দেশিকা জারি করেছে এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) মানদণ্ডের ভিত্তিতে সেবার মানের বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছে। গ্রাহকরা যাতে বিভিন্ন নেটওয়ার্কের পারফরম্যান্স তুলনা করতে পারেন এবং যাতে অপারেটরদের ওপর সেবার মান উন্নত করার চাপ বাড়ে, সে জন্য প্রতি মাসে কিউওএস-এর তথ্য বিটিআরসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘সংশোধিত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ অনুযায়ী কমিশনকে প্রতি চার মাসে একটি করে গণশুনানি করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘গণশুনানিতে উত্থাপিত প্রশ্ন, সুপারিশ ও অভিযোগগুলো বিটিআরসির মনিটরিং তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে।’

ভোক্তারা বিটিআরসির হেল্পলাইন ১০০, গ্রিভ্যান্স রিড্রেস সিস্টেম (জিআরএস), ওয়েববক্স এবং তথ্য অধিকার আইনের আওতায় লিখিত আবেদনের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারেন।

ভয়েস কলের ট্যারিফ পুনর্বিবেচনা, টাওয়ার মনিটরিং ব্যবস্থা এবং মাসিক কিউওএস তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে বিটিআরসি কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তবে সাতটি গণশুনানিতে একই অভিযোগের বারবার ফিরে আসা বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে—প্রযুক্তি নাটকীয়ভাবে বদলে গেলেও অনেক ব্যবহারকারী এখনো মৌলিক সেবাগুলো উন্নত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।