Image description

প্রায় এক যুগ ধরে নিয়মিত মোটরসাইকেল চালান জুয়েল রানা (৪৫)। গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা জুয়েলের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম এখন মোটরসাইকেল। টানা অন্তত সাত ঘণ্টা চালাতে হয় তাকে। ফলে শরীরে, বিশেষ করে হাঁটুতে ব্যথা ও মাংসপেশিতে একধরনের কামড় অনুভব করেন জুয়েল। সেই ব্যথা দূর করতে ফুটপাতে বিক্রি হওয়া ম্যাসাজার থেরাপি মেশিন ব্যবহার করেন তিনি।

 

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বায়তুল মোকাররম মার্কেটের রাস্তার পাশে থেরাপি মেশিন কিনতে দেখা যায় জুয়েলকে। সেখানে কথা হলে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘক্ষণ বাইক চালানোয় হাঁটুর মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা করে। বিশেষ করে রাতে মনে হয় মাংসপেশিতে কেউ কামড় দিচ্ছে, জ্বালাপোড়া হয়। তাই এক বছর ধরে থেরাপি মেশিন ব্যবহার করছি। কিছুটা আরাম লাগে, তাই আগেরটি নষ্ট হওয়ায় পুনরায় কিনতে এসেছি।’

 

এসব থেরাপি মেশিন ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি না, জানতে চাইলে জুয়েল বলেন, ‘সাময়িকভাবে ভালো লাগলেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর কিছু হতে পারে। শুরুতে বুঝতে না পারলেও পরে দেখি পেশিতে জ্বালাপোড়ার তীব্রতা বেড়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মতো সময় নেই। ৯৫০ টাকায় ফুটপাত থেকে নিতে পারছি, মার্কেটে একই মেশিনের দাম দেড় হাজার টাকা।’

 

শুধু জুয়েলই নন, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যথা থেকে মুক্ত হতে হাজারো মানুষ এসব ফিজিওথেরাপি ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করছেন। তবে এসব যন্ত্র ব্যবহারে ক্ষতিকর দিক ব্যাপক হলেও বিক্রেতা ও ক্রেতার মাঝে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি আড়ালেই থাকছে।

 

ফিজিওথেরাপিস্ট ও চিকিৎসকরা বলছেন, ঘরে বসেই ঘাড়, পিঠ কিংবা কোমরব্যথা থেকে মুক্তির আশায় অনেকেই এখন অনলাইন থেকে কম মূল্যের ইলেকট্রনিক থেরাপি গ্যাজেট বা ডিজিটাল টেন্স মেশিন কিনে ব্যবহার করছেন। তবে কোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শ বা সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া যত্রতত্র এসব নিম্নমানের ডিভাইস ব্যবহারের ফলে স্নায়ুর ক্ষতি ও ত্বকে ইনফেকশন থেকে শুরু করে ব্যথার তীব্রতা উল্টো বেড়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। লোভনীয় এই সস্তা সমাধানগুলো সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের শারীরিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

 

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. তছলিম উদ্দিন বলেন, ‘স্বাস্থ্যের যে কোনো পরামর্শ বা চিকিৎসাসামগ্রী প্রেসক্রাইব করার প্রথম শর্তই হলো তাকে নিবন্ধিত চিকিৎসক হতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অননুমোদিত যন্ত্র ঘরে এনে সারা দিন ব্যবহার করলে শারীরিক ক্ষতি হওয়াটা অবধারিত।’

 

তিনি বলেন, ‘বাজারে বা অনলাইনে মিলতে থাকা এসব অননুমোদিত ডিভাইসের সুবিধা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রোগীরা কোনো ধারণা পান না। উদাহরণ হিসেবে কোমরের ব্যথায় তথাকথিত লেজার সার্জারির বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো ব্যাখ্যা বা পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। অথচ বিষয়টি না বুঝে অনেকে বিপুল টাকা খরচ করছেন।’

 

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি ইকুইপমেন্টের বাজার ১২৪ কোটি টাকা

গ্লোবাল মার্কেট রিসার্চ ৬ডব্লিউরিসার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি ইকুইপমেন্টের বর্তমান বাজার ১২৪ কোটি টাকা (১২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার)। প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। ২০৩২ সাল নাগাদ বাজারের আকার বেড়ে ১৮০ কোটি টাকায় রূপ নেবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ঢাকার চার মার্কেটে বেশি বিক্রি

ফিজিওথেরাপি ইকুইপমেন্টের হাব বলা হয়ে থাকে রাজধানীর চকবাজারের বিসমিল্লাহ মার্কেটকে। প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন মার্কেট ও খুচরা বিক্রেতারা এই মার্কেট থেকে পাইকারি দরে এসব যন্ত্র কেনেন। এ ছাড়া স্টেডিয়াম মার্কেট, বিএমএ ভবন এবং মোতালেব প্লাজায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। বাজারে থাকা পণ্যের বেশির ভাগই চীন, ভারত ও তাইওয়ান থেকে আসে।

 

এ বিষয়ে তোপখানা রোডের মক্কা সার্জিক্যাল মার্কেটের ব্যবসায়ী মাজহারুল ইসলাম বলেন, তিন-চার বছর ধরে এসব মেশিনের চাহিদা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য এগুলো কেনা হয়। আগে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫টি বিক্রি হলেও এখন ৫০টির বেশি হয়। ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত এসব থেরাপি ইকুইপমেন্ট রয়েছে। মার্কেটের চেয়ে অনলাইনে বিক্রি বেশি হয়।

 

বিএমএ মার্কেটের ব্যবসায়ী ও বিএমএ ভবন শপ ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক মো. ইলিয়াস সরকার বলেন, ‘চাহিদার সঙ্গে ভেজাল যন্ত্রের হারও বেড়েছে। যার বড় অংশই পাওয়া যায় মিটফোর্ড ও চকবাজারে।’

 

স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানেন না ক্রেতা, এড়িয়ে যান বিক্রেতাও

স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা না জেনেই মায়ের পেটের চর্বি কমানোর জন্য বিএমএ মার্কেটে ইলেকট্রিক ম্যাসাজ বেল্ট কিনতে এসেছেন বিপ্লব হাসান। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে কিনতে এসেছি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা কিছু বলা হয়নি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিইনি।’

 

একই মার্কেটের ব্যবসায়ী এবাদাত হোসেন বলেন, ‘প্রতিটি থেরাপি ইলেকট্রিক, ফলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে। কার জন্য কত ডোজ মেনে দিতে হবে, তা আমাদের জানা নেই। দীর্ঘদিন ব্যবহারে মাংসপেশিতে জ্বালাপোড়া বা ক্ষত হতে পারে। তারপরও মানুষ নিলে আমাদের কিছু করার নেই।’

 

লোভনীয় বিজ্ঞাপনে আকর্ষণ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে চটকদার বিজ্ঞাপন এবং প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পীদের ব্যবহার করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।

 

শ্যামলী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের ফিজিওথেরাপিস্ট ফজলুল হক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন ছাড়া এসব বিক্রি হচ্ছে। হকারদের বিক্রি করা এসব ডিভাইসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সঠিক মাত্রা, ফ্রিকোয়েন্সি ও তীব্রতা বজায় রাখতে না পারলে স্নায়ু ও মাংসপেশিতে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।’

 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিফ ফিজিওথেরাপিস্ট ও বাংলাদেশ সরকারি চাকরিজীবী ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুল ইসলাম অপু বলেন, ‘যে কোনো ইলেকট্রোথেরাপি ব্যবহারের আগে সার্টিফায়েড হতে হয়। রাস্তাঘাটে ও অনলাইনে বিক্রি হওয়া ভারতীয় পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ কোম্পানিরই কোনো সার্টিফিকেট নেই। অননুমোদিত এসব যন্ত্রের ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক না থাকলে টিস্যু ড্যামেজ, নার্ভ ইনজুরি এবং শরীরের ভেতর বার্ন (পোড়া) হতে পারে।’

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘প্রমাণ ও সরকারি অনুমোদন ছাড়া এসব বিক্রি ও বিজ্ঞাপন দেওয়া বেআইনি। ইউটিউব ও ফেসবুকে এগুলোর ব্যাপক প্রচার চালানো হলেও সরকার শক্ত ভূমিকা নিচ্ছে না। সাধারণ মানুষ শারীরিক ক্ষতির মুখে পড়ছে, তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’