Image description

রাজধানীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনায় চাঁদা দাবির বিষয়টি সামনে এসেছে। হামলার ১১ দিন আগে তার মোবাইল ফোনে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করে একটি বার্তা পাঠানো হয়। ওই বার্তায় টাকা পরিশোধের জন্য ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

এর দুই দিন পর, গত ১৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার পর হামলার শিকার হন ৫৫ বছর বয়সী এই চিকিৎসক। অটোরিকশায় ওঠার পর কয়েকজন তার পথরোধ করে হামলা চালায়। এতে তার মাথা, মুখ ও চোখে আঘাত লাগে। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে।

হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর একই নম্বর থেকে তার ফোনে আবারও একটি বার্তা আসে। সেখানে লেখা ছিল ‘হাউ ডু ইউ ফিল নাও’। পরদিন আরও দুটি বার্তা পাঠানো হয় বলে জানান আসাদুর রহমান। একটি বার্তায় জানতে চাওয়া হয়, তিনি আরও ঝামেলা করতে চান কি না। আরেকটিতে তার কাছে গণমাধ্যমকর্মী পাঠানোর কথা বলা হয়।

চিকিৎসক জানান, চাঁদা দাবির বার্তার নিচে ‘ডেভিড ইমন’ নাম লেখা ছিল। তবে বর্তমানে কারাগারে থাকা চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনই এসব বার্তা পাঠিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত নয়। বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।

হামলার বর্ণনা দিয়ে অধ্যাপক আসাদুর রহমান বলেন, চেম্বার থেকে বের হয়ে সিএনজিতে ওঠার পর সেটি কিছুটা এগোতেই কয়েকজন পথ আটকে দেয়। তারা দরজা খুলতে বলছিল। তিনি চালককে দরজা না খুলতে বললেও পরে চালক দরজা খুলে দিলে হামলাকারীরা তাকে মারধর শুরু করে।

হামলাকারীরা তাকে একজন রোগীর স্বজনের বিষয়ে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে দরজা খুলতে বলেছিল বলেও জানান তিনি। তবে ঘটনাস্থল থেকে একজনকে আটক করার পর পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে কোনো নির্দিষ্ট রোগী বা চিকিৎসার বিষয়ে তথ্য দিতে পারেনি।

আসাদুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তি পুলিশকে জানিয়েছে, কেউ একজন তাকে বলেছিল ওই চিকিৎসকের অনেক টাকা আছে এবং তার কাছে গেলে একটি মোবাইল ফোন কিনে দেওয়া হবে। তবে চিকিৎসক নিজেই জানিয়েছেন, এগুলো তার শোনা কথা এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ ভিন্নও হতে পারে।

হামলার ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা করেছেন অধ্যাপক আসাদুর রহমান। এজাহারে তিনি হামলার পাশাপাশি ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তবে এজাহারে ডেভিড ইমনের নাম কিংবা হামলার পর পাঠানো বার্তাগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়নি।

হামলার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের এডিসি নিয়াজ মেহেদী জানিয়েছেন, এ ঘটনায় চারজন পথরোধ করে হামলা করেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও জানান, একটি নম্বর থেকে চিকিৎসককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। কারা ওই নম্বর ব্যবহার করে হুমকি দিয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদ বলেন, হামলার ঘটনায় জীবন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চাঁদা দাবি এবং হামলার নেপথ্যে কারা রয়েছে, সেসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের আলোচিত অপরাধী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গত ২৭ জুলাই রাতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় যশোর সীমান্ত এলাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তিনি বিদেশে অবস্থানরত চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী।

এর আগে রাউজান এলাকায় বালুর মহাল থেকে টাকা তোলার অভিযোগে ডেভিড ইমনের নাম আলোচনায় আসে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বড় সাজ্জাদের সহযোগী রায়হানের মাধ্যমে তিনি অপরাধ জগতে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসে।

গত ১৩ জুলাই বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ডিজিটাল ডটনেট নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিককে ফোন করে ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। চাঁদা না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গত জানুয়ারিতে সাবেক এমপি ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবর রহমান চৌধুরীর বাসায় গুলির ঘটনায়ও ডেভিড ইমনের নাম আলোচনায় আসে। গত বছরের ৩০ মার্চ চন্দনপুরা এক্সেস রোডের কাছে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে গুলি চালিয়ে জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা এবং ৫ নভেম্বর সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যার ঘটনাতেও তার নাম উঠে আসে।

তবে অধ্যাপক আসাদুর রহমানের ওপর হামলার সঙ্গে কারা জড়িত এবং ডেভিড ইমনের নাম ব্যবহার করে চাঁদা দাবি বা হুমকি দেওয়ার পেছনে কারা রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ।