দেশে গ্যাস সংকটের প্রভাব আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় একদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, অন্যদিকে কয়লার ঘাটতিতে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতি ও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে এ সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) গত ১৮ আগস্টের তথ্য বলছে, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ১১৯টি কূপ এবং দুটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মিলিয়ে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা ৩৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। তবে সেখানে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ২২৬২ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট। এ হিসাবে উৎপাদনযোগ্য সক্ষমতার ৪১ শতাংশই থেকে যাচ্ছে অব্যবহৃত।
যার মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস্ কোম্পানি লিমিটেডের পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্রের ৮৫১ এমএমসিএফডির উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৪৭৫.১ এমএমসিএফডি। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্রে ১৪৩ এমএমসিএফডির বিপরীতে ১৪০.৩ এমএমসিএফডি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) আটটি গ্যাসক্ষেত্রে ১৪৫ এমএমসিএফডির বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১১১.৭ এমএমসিএফডি।
এছাড়া আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি শেভরন ও তাল্লো ১৬১৫ এমএমসিএফডি সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন করতে পেরেছে ৯১১.২ এমএমসিএফডি গ্যাস৷ অন্যদিকে, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশে দুটি ভাসমান ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) মাধ্যমে ১১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও এখান থেকে গ্যাস সরবরাহ করতে পেরেছে মাত্র ৬২৪.৬ এমএমসিএফডি।
সরবরাহে বড় ঘাটতি
পেট্রোবাংলার বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আওতাধীন ২১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৯৯৬ এমএমসিএফডি গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ২৬৫.৯ এমএমসিএফডি গ্যাস৷ সার কারখানায় ১১৭ এমএমসিএফডি চাহিদার বিপরীতে ৬৬ এমএমসিএফডি এবং অন্যান্য খাতে ৮৩৩.১ এমএমসিএফডিসহ মোট ১১৬৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে৷ এরমধ্যে যমুনা সার কারখানাসহ ১৫টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল৷
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪২৩.৯ এমএমসিএফডি চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের পরিমাণ ২১৮.৭ এমএমসিএফডি গ্যাস৷ সার কারখানায় ৫২ এমএমসিএফডির বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল৷ অন্যান্য খাতে ৭৭.৫ এমএমসিএফডিসহ মোট ২৯৬.২ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে৷ এরমধ্যে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডসহ ৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল।
দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ১১৯টি কূপ এবং দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মিলিয়ে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা ৩৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। তবে সেখানে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ২২৬২ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট।—পেট্রোবাংলার গত ১৮ আগস্টের তথ্য
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৮৫ এমএমসিএফডির বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ৩১.৩ এমএমসিএফডি। সার কারখানায় ১১৫ এমএমসিএফডির বিপরীতে ৫০.৪ এমএমসিএফডি এবং অন্যান্য খাতে ১২৫.৪ এমএমসিএফডিসহ মোট ২০৭.১ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে৷
জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের ১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৩৯৫ এমএমসিএফডির বিপরীতে ২৭৪.৯ এমএমসিএফডি, সার কারখানায় ৪৫ এমএমসিএফডির বিপরীতে ৩৫.৪ এমএমসিএফডি এবং অন্যান্য খাতে ১০৭.১ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়ছে৷ সব মিলিয়ে কোম্পানিটি গ্যাস সরবরাহ করেছে ৪১৭.৪ এমএমসিএফডি।
পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৪৭ এমএমসিএফডি গ্যাসের বিপরীতে ৮৫.৩ এমএমসিএফডি এবং অন্যান্য খাতে ৩০.৭ এমএমসিএফডিসহ মোট ১১৬.১ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।
সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৭৮ এমএমসিএফডির বিপরীতে ৬৯ এমএমসিএফডি এবং অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ৬.৩ এমএমসিএফডি। সব মিলিয়ে কোম্পানিটি ৭৫.৩ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করেছে৷
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার না হলেও এসব কেন্দ্রের উদ্যোক্তাদের দিতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। অর্থাৎ, কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সক্ষমতার জন্য সরকারকে অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
কয়লা সংকটের কারণে পায়রা ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র ট্রিপ (বন্ধ) করেছে৷ আশা করছি, শিগগির সমস্যা কেটে যাবে৷ আপাতত গ্যাস মোটামুটি পাচ্ছি।—মো. জহুরুল ইসলাম
এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে যেসব কেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বা কম চাহিদার কারণে বসে থাকে, সেগুলোর জন্যও ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। বিশেষত, গ্যাস সংকটের সময় অনেক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব না হলেও ক্যাপাসিটি পেমেন্টের দায় থেকে যাচ্ছে।
বন্ধ এক ভাসমান টার্মিনাল
কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির, অন্যটি দেশি কোম্পানি সামিটের। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের বড় প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে।
এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ (ভাসমান টার্মিনাল) প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর গত ৬ আগস্ট মেরামত শেষে এটি আংশিকভাবে চালু হয় এবং শুরুতে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১১৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
এরপর গত ১১ আগস্ট জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, টার্মিনালটি পুরো সক্ষমতায় ফেরাতে আবারও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। কারণ, একটি বয়লারে উৎপাদন চলমান থাকায় পুরো এফএসআরইউ একসঙ্গে চালানো যাচ্ছিল না।
অন্যদিকে সামিটের এফএসআরইউ থেকেও আগস্টে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় টার্মিনালে থাকা এলএনজি কার্গো থেকে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হয় এবং কার্গোটি টার্মিনাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ১৩ আগস্ট বিকেলে সরবরাহ শুরু হলেও পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে প্রায় ১৯০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছিল।
পরে ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে সামিটের টার্মিনাল আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। শুরুতে প্রায় ১১০ এমএমসিএফডি সরবরাহ করা হয় এবং ধীরে ধীরে তা ৫৫০ এমএমসিএফডি সক্ষমতায় নেওয়ার কথা জানানো হয়।
গ্যাস সংকটের মূল কারণ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান না করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অধিক নির্ভরতা৷ এ ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে৷ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান করে কাজে লাগাতে হবে৷ এটি করতে পারলে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমাদের গ্যাস রপ্তানিরও সম্ভাবনা তৈরি হবে।—অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম
মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি এবং দেশি কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ। এর মধ্যে গত শনিবার (১৫ আগস্ট) সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলেও বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকেল ৩টায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
দেশের বিভিন্ন জোনে লোডশেডিং চিত্র
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, ১৮ আগস্ট দেশে সন্ধ্যা পিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট এবং উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট৷ তবে ডে পিকে ১৪ হাজার ৮৮০ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও উৎপাদনের তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি৷
একই দিন ঢাকা জোনে ১৫০ মেগাওয়াট, কুমিল্লা জোনে ৬৫ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহ জোনে ২০০ মেগাওয়াট, সিলেট জোনে ৫০ মেগাওয়াট, খুলনা জোনে ১৫০ মেগাওয়াট, রাজশাহী জোনে ৭০ মেগাওয়াট এবং রংপুর জোনে ৬০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে৷ তবে বরিশাল ও চট্টগ্রাম জোনে কোনো লোডশেডিং করা হয়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি৷
দেশে চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, কয়লা সংকটের কারণে পায়রা ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র ট্রিপ (বন্ধ) করেছে৷ আশা করছি, শিগগির সমস্যা কেটে যাবে৷ আপাতত গ্যাস মোটামুটি পাচ্ছি।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম জাগো নিউজকে বলেন, গ্যাস সংকটের মূল কারণ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান না করে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অধিক নির্ভরতা৷ এ ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে৷ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান করে কাজে লাগাতে হবে৷ এটি করতে পারলে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমাদের গ্যাস রপ্তানিরও সম্ভাবনা তৈরি হবে।