Image description

রোগীর কল্যাণের কথা বলে জাকাত সংগ্রহ করে আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তির থেকে প্রতি বছর বড় অঙ্কের অনুদান পায় হাসপাতালটি। কিন্তু সেই টাকা রোগীর পেছনে খরচ না করে জমা রাখছে ব্যাংকে। তাতে মিলছে বড় অঙ্কের সুদ। পাশাপাশি নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে করা হচ্ছে বিনিয়োগ। অন্যদিকে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বেসরকারি শীর্ষ হাসপাতালগুলোর মতো চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে রোগীদের। অথচ কথা ছিল, জাকাত ও অনুদানের টাকায় রোগীরা বিনামূল্যে থেকে শুরু করে একেবারে কমমূল্যে চিকিৎসাসেবা পাবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময়ে ক্যানসার চিকিৎসায় দেশের অনন্য প্রতিষ্ঠান ছিল এ হাসপাতাল। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, আহছানিয়া মিশনের মুনাফার দিকে গুরুত্বের ফলে ডুবতে বসেছে হাসপাতালটি। ক্যানসার থেকে এখন সাধারণ অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় জোর দেওয়া হচ্ছে। সীমিত হয়ে আসছে ক্যানসার চিকিৎসার পরিধি।

মাসে হাসপাতাল থেকে আয় ৩০ কোটি

২০০১ সালে ‘আহছানিয়া মিশন ক্যানসার ডিটেকশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ নামে যাত্রা শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির। ২০১৪ সালে ক্যানসার আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সে সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এককালীন হিসেবে ৭৪ কোটি টাকা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৩৯ কোটি টাকা অনুদান দেয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, বছর কয়েক আগে প্রতি বছর জাকাত থেকে তিন কোটি টাকার মতো। গত বছরও দুই কোটি টাকার বেশি এসেছে। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত জাকাত এসেছে ৫৫ লাখ টাকা। এ ছাড়াও প্রতি বছর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে দুই কোটি টাকার বেশি অনুদান আসে। এ ছাড়া সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয় এক থেকে দেড় কোটি। সবমিলিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয় ৫ থেকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি। তবে হাসপাতালের সেবা খাত থেকে প্রতি মাসে কী পরিমাণ আয় জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন হাসপাতালটি।

হাসপাতালের মাসিক আয় জানতে সাবেক পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। এশিয়া পোস্টকে তারা জানিয়েছেন, হাসপাতালে ওষুধ বিক্রি, রোগ নির্ণয় ফি, শয্যা ভাড়াসহ হাসপাতালের সামগ্রিক আয় ৩০ কোটি টাকার মতো; বছরে যা দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি।

টেস্ট, ভর্তি ফি বেসরকারি শীর্ষ হাসপাতালের মতোই

লিভার ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে গত ৫ জুন সালেহা বেগমকে (৬৫) ভর্তি করা হয় উত্তরার আহছানিয়া মিশন ক্যানসার ও জেনারেল হাসপাতালে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও সংস্থার অর্থায়নে চলে বলে অনেকটা সরকারি খরচে চিকিৎসা মিলবে এমন আশা থেকে এ হাসপাতালে মাকে ভর্তি করান তাসলিমা জাহান।

ভর্তির তিন দিনে শুধু রোগ নির্ণয়েই গুনতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এ ছাড়া দৈনিক শয্যা ভাড়া দুই হাজার ২০০ টাকা, ডাক্তার ফি এক হাজার টাকাসহ দুজন মানুষের খাওয়া ও অন্যান্য খরচ মিলে পাঁচ দিনে প্রায় ৫০ হাজার টাকা গেছে। তখনও শুরু হয়নি সালেহার পূর্ণ চিকিৎসা।

তাসলিমার ভাষ্য, বেসরকারি আরদশটা করপোরেট হাসপাতাল নাকি চ্যারিটেবল কোনো প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিচ্ছি সেটি পার্থক্য করা যাচ্ছে না। যে প্রতিষ্ঠান মানুষের দান ও অনুদানের টাকায় চলে, সেখানে এত বেশি খরচ কেন হবে? একেকটা টেস্টের দাম প্রথম সারির বেসরকারি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের মতোই।

সম্পূর্ণ অনুদানের হাসপাতালে এমন চড়া দামে চিকিৎসা কেনার অভিজ্ঞতা শুধু এ পরিবারের নয়, চিকিৎসা নিতে আসা হাজার হাজার রোগীর।

সম্প্রতি সরেজমিন হাসপাতালে গেলে, ঢুকতেই চোখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটিতে কী কী রোগ নির্ণয় হয় এবং কত টাকায় করা হয় সেই তালিকা। এতে দেখা যায়, রক্তে কোলেস্টরেল ও চর্বির পরিমাণ জানতে সর্বাধুনিক পরীক্ষা লিপিড প্রোফাইল করাতে গুনতে হয় এক হাজার ২০০ টাকা, যা দেশের যে কোনো বেসরকারি শীর্ষপর্যায়ের ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের পপুলারের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি বা কিছুটা বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেসরকারি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে এই টেস্টের দাম এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত।

প্রথম সারির বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেইনের সিটি স্ক্যানে গুনতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। অনুদানের হাসপাতাল হলেও সমপরিমাণ টাকা দিতে হয় আহছানিয়া হাসপাতালে। অথচ এই পরীক্ষা চার হাজার টাকায়ও করা যায় বেসরকারি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে।

শুধু এ দুই পরীক্ষা নয়, শরীরে আয়রনের মাত্রা জানতে করা এস আয়রন প্রোফাইল টেস্ট করাতে লাগে তিন হাজার, বুকে ব্যথা বা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে করা ট্রপোনিন আই এক হাজার ২০০ টাকা, গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি, গঠন দেখার জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি অব প্রেগন্যান্সি প্রোফাইল এক হাজার ২০০ টাকা, সিটি স্ক্যান (চেস্ট) ছয় হাজার টাকা, চেষ্টের এমআরআই সাত হাজার টাকা- যা দেশের শীর্ষ বেসরকারি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোর দামের সমান বা কাছাকাছি।

প্রতিষ্ঠানটির একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সঙ্গে কথা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাম বছর কয়েক আগেও সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটি বাড়ানো হয়েছে। এখানে দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা আসেন, শুধু কম দামে ভালোমানের চিকিৎসা পেতে। কিন্তু এখন সবকিছুই ব্যবসা হয়ে গেছে।’

কম দামে ওষুধ কিনে বাজারদরে বিক্রি

জটিল ও মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় শিরায় ইনজেকশন হিসেবে ব্যবহৃত হয় অ্যান্টিবায়োটিক মেরোপেনেম (এক গ্রাম)। বাজারে এ অ্যান্টিবায়োটিকের দাম এক হাজার ২৩৫ টাকা। চ্যারিটেবল প্রতিষ্ঠান হওয়ায় আহছানিয়া হাসপাতালকে ওষুধ প্রস্তুতকারী একটি কোম্পানি ট্রেড প্রাইস বা নির্দিষ্ট দাম ৭০০ টাকায় দিয়ে থাকে। উদ্দেশ্য, রোগীদের সুলভমূল্যে দেওয়া।

কিন্তু হাসপাতালটির ফার্মেসি বিভাগে গিয়ে খোঁজ নিলে দেখা যায়, রোগীদের কাছে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য এক হাজার ২৩৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। একই ঘটনা ঘটেছে ক্রিটিক্যাল কেয়ারে বা গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত আরেক অ্যান্টিবায়োটিক নিউপেনেমও। এটিও ৭০০ টাকায় কেনা হলেও রোগীদের কিনতে হচ্ছে এক হাজার ২৮৩ টাকায়।

শুধু এ দুই অ্যান্টিবায়োটিক নয়, আরও বেশকিছু ওষুধে ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো রোগীদের স্বার্থে বিশেষ ছাড় দিলেও তার সুফল পাচ্ছেন না রোগীরা। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

আইসিইউতে নষ্ট অধিকাংশ ভেন্টিলেটর, ফেরত যেতে হয় রোগীদের

৩৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ১৫টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। প্রত্যেকটিতে রয়েছে একটি করে ভেন্টিলেটর বা জীবনরক্ষাকারী শ্বাসযন্ত্র। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছয় মাস ধরে অধিকাংশ ভেন্টিলেটর বিকল হয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে কয়েকটি ঠিক করা হলেও বাকিগুলো বিকল। এ অবস্থায় একদিকে অনেক সংকটাপন্ন রোগী আসলেও ফেরত যেতে হচ্ছে, আবার যারা চিকিৎসাধীন, তাদেরও সুস্থ হতে বেশি সময় লাগছে, এমনকি ভেন্টিলেটর সমস্যা একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, ভেন্টিলেটর রোগীর জীবন-মৃত্যুর সমস্যা। এটি বিকল হলে রোগীর শরীরে তাৎক্ষণিকভাবে অক্সিজেনের মারাত্মক অভাব (হাইপোক্সিয়া) দেখা দেয় এবং মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আইসিইউ ইনচার্জ ডা. জাকারিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সমস্যার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ জানে। আমি চিকিৎসক, কর্তৃপক্ষ যে ধরনের ফ্যাসিলিটিজ (সুযোগ-সুবিধা) দিয়েছে, সেখান থেকেই আমাকে চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে।’ এর বেশিকিছু বলতে রাজি হোননি তিনি।

রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে মাস পর

বছর খানেক আগে স্তন ক্যানসার শনাক্ত হয় ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ফাতেমা বেগমের (৪৮)। নিজ বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষায় শনাক্ত হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। তবে সেখানে তিন মাসেও চিকিৎসা শুরু করতে না পেরে ধানমন্ডির বেসরকারি একটি হাসপাতালে মাস ছয়েক চিকিৎসা নিলেও খরচ মেটাতে না পেরে আসেন আহছানিয়া ক্যানসার হাসপাতালে।

স্বামী বয়স্ক হওয়ায় নানা জটিলতা নিয়ে বিছানায়। একমাত্র ছেলে রিকশাচালক তিনিও পরিবার নিয়ে থাকেন আলাদা বাসায়। ধারদেনা করে এ হাসপাতালে রেডিওথেরাপি নিতে এসেছেন ফাতেমা বেগম। গত ১৬ জুন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অত্যন্ত বিমূর্ষ ফাতেমা বেগম রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে কখনও তথ্য কেন্দ্রে যাচ্ছেন, কখনও বা হাসপাতালের স্টাফদের কাছে অনুরোধ করছেন।

ফাতেমা বেগম জানান, স্বামী কাজ করতে পারেন না, নিজেই অসুস্থ। ছেলে কিছু টাকা দিয়েছে আর মানুষের কাছে ধারদেনা করে কিছুদিন চিকিৎসা নিয়েছি। বেসরকারিতে চিকিৎসা করার মতো টাকা নেই, সরকারিতে ভর্তি নেয় নাই। এ হাসপাতালে আসছি তিন দিন ধরে ঘুরছি, কিন্তু এক মাসের মধ্যে সিরিয়াল দিচ্ছে না।

হাসপাতালটিতে রেডিওথেরাপি পেতে এমন দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প ফাতেমার মতো শত শত ক্যানসার রোগীর। সক্ষমতার তুলনায় রোগীর চাপ যেমন বেশি, একই সঙ্গে যন্ত্রগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ায় পর্যাপ্ত সেবা দিতে পারছে না। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১০০-১২০ জন রেডিওথেরাপি পেলেও অন্যদের ফেরত যেতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে চারটি রেডিওথেরাপির যন্ত্র রয়েছে। ২০১৪ সালে এসব যন্ত্র স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে একাধিক যন্ত্রের মেয়াদ শেষের পথে। ফলে ঠিকমতো রেডিয়েশন পড়ে কি না সেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

জানতে চাইলে রেডিওলোজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. অরুপ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বর্তমানে চারটি রেডিওথেরাপি ও দুটি বেকিথেরাপি যন্ত্র রয়েছে এ হাসপাতালে। এর বাইরে নষ্ট ও মেয়াদোত্তীর্ণ এমন পাঁচটি যন্ত্রের মধ্যে কয়েকটি ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়েছে, বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন।

তিনি বলেন, রোগীর তুলনায় যন্ত্রের যথেষ্ট অভাব। পুরো বাংলাদেশেই রেডিওথেরাপি মেশিন মাত্র ৩৫টির মতো। যেখানে দরকার ২৮০টি। এত অল্প যন্ত্র দিয়ে বিপুল পরিমাণ মানুষের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়৷ ফলে সিরিয়াল পেতে রোগীদের বিলম্ব হয়। আর মেশিনেরও ধারণক্ষমতা রয়েছে। দৈনিক ৫০ থেকে ৬০টির মতো থেরাপি দেওয়ার কথা, সেখানে করা হচ্ছে দ্বিগুণ। নতুন যন্ত্র না কিনলে চাপ কমবে না।

অদক্ষ নার্স দিয়ে চলে সেবা

হাসপাতালটিতে দুই শতাধিক নার্স কর্মরত। এর মধ্যে বড় একটি অংশ অদক্ষ বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে রোগীর ক্যানুলা করতেও গোলমাল পাকিয়ে ফেলেন এখানকার কিছু কিছু নার্স।

বিষয়টি নিয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. আবদুল্লাহ্-আল-মামুন বলেন, ‘আমি যোগদানের আগে কী হয়েছে জানি না। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দক্ষ নার্সদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ক্যানুলা শুধু নার্সরা দেয় না, ডাক্তাররাও অনেক দেন। ক্যানুলা দিতে গিয়ে নার্সদের অদক্ষতা ও বিভিন্ন কারণে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ জন্য নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’

হাসপাতালের অর্থে ফ্যাশন হাউস ও হজ এজেন্সিতে ব্যবহারের অভিযোগ

বিপুল পরিমাণ এ আয়ে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ মানের হওয়ার কথা। দরিদ্ররা বিনামূল্যে আর অন্যান্য শ্রেণির মানুষ একেবারে কমমূল্যে চিকিৎসাসেবা কিনতে পারবেন এটাই হওয়ার কথা। কিন্তু আহছানিয়া ক্যানসার ও জেনারেল হাসপাতালে ঘটেছে এর বিপরীত।

সরেজমিন অনুসন্ধানে হাসপাতালের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে জাকাত ও অনুদানের অর্থ সরাসরি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও আহছানিয়া মিশন তা ব্যবসায় ঘাটাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বর্তমান প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, রোগীদের চিকিৎসার জন্য দেওয়া অর্থ মিশন ব্যাংকে এফডিআর করে প্রতি বছর মুনাফা তুলছে। পাশাপাশি সেই অর্থ দিয়ে রাজধানীর বসুন্ধরা শপিংমলে ‘নগরদোলা’ নামে একটি ফ্যাশন হাউস গড়া হয়েছে।

হাসপাতালটির সাবেক একজন পরিচালক এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রতি বছর শুধু জাকাত থেকে দেড় থেকে তিন কোটি টাকা আসে। কিন্তু সেই অর্থ দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালে চিকিৎসায় ব্যয় না করে ৮ কোটি টাকা আহছানিয়া মিশন ব্যাংকে এফডিআর করে ব্যাংকে রেখেছে। বারবার চিঠি দেওয়ার পরও তারা ফেরত দেয়নি। প্রতি মাসে বড় অঙ্কের মুনাফা আসে সেখান থেকে। অথচ শুধু রোগীদের চিকিৎসার জন্য মানুষ এই টাকা জাকাত দিয়েছে। গভর্নিং বডির অনুমতি ছাড়াই এসব টাকা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, হাসপাতালের টাকা দিয়ে তারা ফ্যাশন হাউস খুলেছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী দেশের দরিদ্র ক্যানসার রোগীরা ভর্তি থেকে শুরু করে চিকিৎসা, ওষুধ, খাবারসহ সবকিছুই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। আগে জাকাত মানুষ সরাসরি হাসপাতালে দিয়ে যেত। এমনকি কোনো কোনো ব্যবসায়ী ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছে। একপর্যায়ে জাকাতের টাকা ঠিকমতো ব্যবহার হচ্ছে কি না অনেক দাতারা জানতে চান। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সরাসরি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় করত। কিন্তু মিশন অফিস তাতে বাধা দিত। তারা জানায়, হাসপাতালে নয়, এই অর্থ মিশনের অফিসে জমা দিতে হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, শুধু জাকাত নয়, মেডিকেল কলেজের তিন কোটি টাকাও নিয়েছে। অনেক চেষ্টার দুই কিস্তিতে প্রায় দুই কোটি টাকা ফেরত দিলেও বাকিটা এখনও বাকি। ক্যানসার চিকিৎসায় দেশের সেরা একটি হাসপাতাল ছিল এটি। সেখানে এখন মেডিকেল কলেজ হয়েছে, ফলে জেনারেল হাসপাতাল রূপে নিয়েছে। মেডিকেল কলেজ তো লাভজনক প্রতিষ্ঠান। হাসপাতালের জায়গায় করায় ক্যানসার চিকিৎসায় প্রতিনিয়ত সীমিত হয়ে আসছে।

হাসপাতালের টাকা সরানোর ব্যাপারে জানতে আহছানিয়া মিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. গোলাম রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে কথা বলেছেন, মিশনের কোষাধ্যক্ষ হলেন ড. এম এ জলিল। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, জাকাতের টাকা সরানোর বিষয়টি সত্য নয়। এফডিআর করা থাকলে সেটি অনুদানের টাকা হতে পারে। ফ্যাশন হাউস ও হজ এজেন্সি আছে। তবে এখানকার অর্থ দিয়ে করা হয়েছি বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

উচ্চমূল্যে চিকিৎসাসেবা, রোগীদের ভোগান্তি ও নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা হয় আহছানিয়া মিশন ক্যানসার ও জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. আবদুল্লাহ্-আল-মামুনের সঙ্গে।

এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, চ্যারিটেবল প্রতিষ্ঠান হলেও এটাকে সাসটেইন (টিকিয়ে রাখা) করতে হবে। ১০০ টাকা ব্যয় করে সমানসংখ্যক টাকা আয় করতে না পারলে প্রতিষ্ঠান চলবে কীভাবে? চিকিৎসক, নার্সসহ ৮ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে এ হাসপাতালে। তাদের বেতন অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি মেরামতেও তো খরচ রয়েছে। এগুলোর জন্য অর্থ দরকার। আমরা অন্য বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে অনেক কম খরচে চিকিৎসা দেই, আবার কেউ সহযোগিতা চাইলে সেটাও করা হয়।

আইসিইউতে ভেন্টিলেটর বিকলের বিষয়ে আবদুল্লাহ্-আল-মামুন বলেন, আইসিইউতে তিনটি ভেন্টিলেটর নষ্ট রয়েছে। এ ছাড়া কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তাই জরুরি যেসব সংকটাপন্ন রোগী আসে তাদের ভর্তি নেওয়া হয় না। আইসিইউতে নিয়ে যদি ভেন্টিলেটর দিতে না পারি, তাহলে ভর্তি করে কী করব।

পরিচালক বলেন, টেস্টের খরচের উচ্চমূল্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে ওষুধ বিক্রিতে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে কি না সেটিও তদন্ত করা হবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব (বেসরকারি হাসপাতাল) মো. মহসীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, সবকিছু আমাদের নখদর্পণে নেই। বোর্ডে সদস্য হলেও যাওয়া হয় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়গুলো দেখার কথা। তারপরও যেহেতু তদারকির দায়িত্ব আমাদের, বিষয়টি অবশ্যই দেখা হবে।