Image description

২০ বছর বয়সে সোহেল ইসলাম ছিলেন একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। কিন্তু সমবয়সীদের ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে ভালো আয় করতে দেখে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন। নেমে পড়েন দ্রুত টাকা উপার্জনের এই পেশায়।

ভোলা থেকে ঢাকায় আসা সোহেল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতিদিন হাতে নগদ টাকা পেতে শুরু করায় আমি এখন ফুলটাইম রিকশা চালাই।’

প্রায় এক বছর আগে একই রকম গল্প নিয়ে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন ১৯ বছরের এক তরুণ। দারিদ্র্যের কারণে তার পড়াশোনায় দেরি হয়েছিল, ফলে নবম শ্রেণীতে উঠতেই বয়স হয়ে যায় ১৭। একসময় পরিবারকে সহায়তা করতে স্কুল ছেড়ে রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে পেশা পাল্টে হয়ে যান ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক।

তিনি বলেন, ‘এখন আমি দিনে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত আয় করি।’

গবেষকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। তাৎক্ষণিক উপার্জনের সুযোগ থাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা হাজার হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলেও তরুণদের দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

‘আর্বান মোবিলিটি স্টাডি: রিকশাজ ইন ট্রানজিশন’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা খাতে প্রবেশ করছে।

প্যাডেলচালিত রিকশাচালকদের গড় বয়স যেখানে ৪২ বছর, সেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের গড় বয়স ৩৮ বছর। চালকদের প্রায় ৭৫ শতাংশই এই পেশায় নতুন, যারা এর আগে কখনো প্যাডেল রিকশা চালাননি।

চট্টগ্রাম শহরে পরিচালিত ‘রোল অব ব্যাটারি-অপারেটেড রিকশা ইন ইনকাম অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন অব আর্বান বাংলাদেশ’ শীর্ষক আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের একটি অংশ আগে বেকার শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের বয়স মূলত ১৬ থেকে ৩০ বছর।

২০১৮ সালের ওই গবেষণায় উঠে আসে, স্বল্প বিনিয়োগের সুবিধার কারণে ৪৩ শতাংশ, স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকায় ২৭ শতাংশ এবং বেশি আয়ের আশায় ১৭ শতাংশ চালক এই খাতে যুক্ত হয়েছেন।

রংপুর সিটি কর্পোরেশনে পরিচালিত ২০২৪ সালের ‘প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস অব ই-রিকশাজ ইন আর্বান ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, রিকশাচালকদের নয় শতাংশ ছিলেন সাবেক শিক্ষার্থী, যারা পরবর্তীতে এটিকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, আগে চালকদের মধ্যে ২৩ শতাংশ কৃষক, ১৩ শতাংশ প্যাডেল রিকশাচালক, ১২ শতাংশ বেকার, ১০ শতাংশ দিনমজুর এবং ১০ শতাংশ বেসরকারি খাতের কর্মচারী ছিলেন।

সহজ আয়, কম বাধা

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কম দক্ষতা, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বল্প বিনিয়োগের প্রয়োজন হওয়ায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো অন্যান্য অনেক পেশার তুলনায় বেশি আয়ের সুযোগ দেয়।

ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের দৈনিক মোট গড় আয় ৮৮০ টাকা, যেখানে প্যাডেল রিকশাচালকদের দিনে আয় হয় ৫৯৪ টাকা।

ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো শুরু করার আগে ৭২ দশমিক ১৯ শতাংশ চালক দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতেন। রিকশা পরিবর্তনের পর প্রায় ৮৯ দশমিক ৪০ শতাংশ চালক জানান, তারা এখন মাসে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করতে পারছেন।

ব্যাটারিচালিত রিকশা। ছবি: টাইমস

তবে গবেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই স্বল্পমেয়াদী আর্থিক লাভ ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাদের মতে, শহরের দরিদ্র পরিবারগুলো প্রায়ই শিক্ষা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে হিমশিম খায়। অল্প বয়সে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলে তরুণদের শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে স্কুলে ফেরার সম্ভাবনাও কমে যায়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা সাময়িকভাবে দরিদ্র পরিবারের আর্থিক চাপ কমাতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা স্বল্পমেয়াদে দরিদ্র পরিবারগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এর আশঙ্কাজনক প্রভাব রয়েছে। শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আগ্রহ কমছে, অন্যদিকে তাৎক্ষণিক উপার্জনের সুযোগ অনেক পরিবারের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।’

দক্ষতা উন্নয়নের সীমিত সুযোগ তরুণ কর্মীদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই কাজগুলো কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসবে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি আকতার মাহমুদ বলেন, বিষয়টিকে কেবল রাস্তায় রিকশার সংখ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়।

তিনি বলেন, ‘এই প্রবণতার পেছনের আর্থ-সামাজিক কারণগুলো চিহ্নিত করা জরুরি।’

বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাশরুর বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার এভাবে বেড়ে যাওয়া অন্যান্য খাতে চাকরি হারানোর পরিস্থিতির সঙ্গেও আংশিকভাবে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। সেই চাপ সামলাতে সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিয়েছে। তবে এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না।’