Image description

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক অঙ্ক এখনো মেলেনি। সফরের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমন্ত্রণও এসেছে। দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগও চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফরটি কবে হবে, আদৌ এখনই হবে কি না—তা নিশ্চিত নয়। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ভারতীয় কূটনীতিকদের বক্তব্যে দুই ধরনের সুর শোনা যাচ্ছে। কেউ দেখছেন সুযোগ। কেউ দেখছেন ঢাকার অবস্থানে অস্বস্তি। আবার বর্তমান কূটনৈতিক নেতৃত্বের ভাষায় আছে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি ঢাকার অবস্থানকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তার মতে, তারেক রহমানের ভারত সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত করা কূটনৈতিকভাবে অস্বাভাবিক। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ‘রূঢ়’ ও ‘অহংকারী’ বলেছেন। অন্যদিকে ভারতের সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি সম্ভাব্য সফরকে দেখছেন নতুন সুযোগ হিসেবে। তার মতে, তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার দরজা খুলতে পারে।

আর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের বর্তমান হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে স্মরণীয় অভ্যর্থনা জানানো হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে এ আশ্বাস দিতে বলেছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি। অর্থাৎ, একই সফরকে ঘিরে দিল্লির পুরোনো কূটনৈতিক মহলে যেমন সতর্কতা ও অসন্তোষের ভাষা আছে, তেমনি বর্তমান সরকারি প্রতিনিধিদের বক্তব্যে আছে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের দ্য ওয়েস্টিন হোটেলে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসবের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন দীনেশ ত্রিবেদী। বাংলাদেশ সফররত ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সম্মানে ভারতীয় হাইকমিশন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে স্মরণীয় একটি অভ্যর্থনা জানানো হবে। সেটিই তার প্রাপ্য। তারা আন্তরিক অভ্যর্থনা জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনীতির ভাষা ছিল না। ছিল ব্যক্তিগত বার্তার ইঙ্গিতও।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি সরাসরি দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মোদি তাকে বলেছেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বৈঠক হওয়া প্রয়োজন। তারেক রহমান ভারত সফরে এলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলেছেন। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, এই সফরের সুফল শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছেই পৌঁছাবে।

এ বক্তব্যের কয়েক দিন আগে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগে নতুন তৎপরতা দেখা যায়। ১০ আগস্ট তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। এরপর ১১ আগস্ট দিল্লি গিয়ে তিনি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীসহ বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে তার আলোচনার বার্তাই তিনি দিল্লিতে পৌঁছে দেন। তবে সম্পর্কের এই উষ্ণতার নিচে জমে আছে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে। বাংলাদেশ চাইছে তাকে ফেরত পাঠানো হোক। পাশাপাশি শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরও হস্তান্তরের দাবি রয়েছে। ঢাকার অবস্থান হলো, তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ দরকার। সেই পরিবেশ তৈরিতে নয়াদিল্লির কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি।

মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বীণা সিক্রি বলেন, তারেক রহমানের ভারত সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে যুক্ত করা বিস্ময়কর। তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভাষায় বিষয়টি তুলে ধরেছে, তা ‘অত্যন্ত রূঢ় ও অহংকারী’। বীণা সিক্রির যুক্তি, প্রত্যর্পণ একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। তা শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তাহলে তারেক রহমান কি সেই আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভারতে যেতে চাইবেন না—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তার বক্তব্যের ভেতরে একটি রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট। ভারত চায় তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি হোক। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে সফরের পূর্বশর্ত করা হলে সেই যোগাযোগ শুরু হওয়ার আগেই তা জটিল হয়ে যেতে পারে—এটাই বীণা সিক্রির আশঙ্কা। তিনি বলেন, উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য নির্দিষ্ট কূটনৈতিক প্রস্তুতি থাকে। সেই প্রক্রিয়ার বদলে প্রকাশ্য বক্তব্যের মাধ্যমে শর্ত আরোপ করলে সফরের পরিবেশ কঠিন হয়ে যায়।

 

বীণা সিক্রি আরও মনে করিয়ে দেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ভারত আশা করেছিল, তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরগুলোর একটি হবে নয়াদিল্লি সফর। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই সফর হয়নি। বীণা সিক্রির বক্তব্যের সুর এখানেই শেষ নয়। শেখ হাসিনাকে নিয়েও তিনি আগে ভারতের অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন। এমনকি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে আরেক সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনির বক্তব্য অনেকটাই ভিন্ন। গত সোমবার (১৭ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোনি বলেন, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতেও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার চোখে তিস্তা একটি বড় বিষয়। দুই দেশ তিস্তা নিয়ে অনেক দূর এগোলেও শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের সমাধান হয়নি। তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

রোহিঙ্গা সমস্যার কথাও বলেন সোনি। তার মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ রয়েছে। তাই বাংলাদেশ চাইলে এই ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব কাজে লাগাতে পারে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সোনির মূল্যায়ন ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, তারেক রহমান তুলনামূলকভাবে খোলামেলা এবং ভারতবিরোধী নন। ফলে তার ভারত সফর দুই দেশের মধ্যে নতুন বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সোনির আশঙ্কাটিও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এই সুযোগ নষ্ট হলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের দরজা দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই উভয় দেশেরই সুযোগটি কাজে লাগানো উচিত।

দুই সাবেক কূটনীতিকের বক্তব্যে যেন দিল্লির দুই মনোভাব ধরা পড়ছে। বীণা সিক্রি বলছেন, ঢাকার শর্ত কূটনৈতিকভাবে অস্বাভাবিক। সোনি বলছেন, সফরটি বরং অমীমাংসিত বিষয় মেটানোর সুযোগ। আর দীনেশ ত্রিবেদী বলছেন, সম্পর্কের দরজা খোলা। অতিথিকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিও আছে। গতকাল মঙ্গলবার গুলশানের অনুষ্ঠানে দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে অনেকটাই পারিবারিক সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করেন। তার ভাষায়, দুই দেশের মধ্যে ছোটখাটো ভুল-বোঝাবুঝি বা বাধা এসেছে। পরিবারেও এমনটা ঘটে। তাই বলে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না।

তিনি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতি রয়েছে। পুরোনো সমস্যাগুলো সমাধান করে দুই দেশকে সামনে এগোতে হবে। স্থবির হয়ে থাকার সুযোগ নেই। দীনেশ ত্রিবেদীর আরেকটি বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যেকোনো সম্পর্কের ভিত্তি হলো শর্তহীন পারস্পরিক বিশ্বাস। তার মতে, দুই দেশের যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোর সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ভারতের জনগণের নেতা নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লি যেন ঢাকাকে একটি রাজনৈতিক বার্তাই দিল—দরজা বন্ধ হয়নি। তবে ঢাকার অবস্থানও বদলায়নি। গতকাল বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে তার কাছে নতুন কোনো তথ্য নেই। সফর যখন যে দেশে ঠিক হবে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই তা জানানো হবে। অর্থাৎ, ভারতের পক্ষ থেকে যতই আগ্রহের কথা বলা হোক, ঢাকার পক্ষ থেকে এখনো সফরের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।

শামা ওবায়েদের বক্তব্যে অবশ্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্য একটি দিক উঠে এসেছে। একই দিন গুলশানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু দুই দেশের বাণিজ্য এখনো কাঠামোগতভাবে ভারসাম্যহীন। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য ভারতের ব্যবসায়িক ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত করার আহ্বানও জানান তিনি। তার মতে, এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ভারতে যেতে পারবেন। দুই দেশের বেসরকারি খাতের যোগাযোগও বাড়বে।

এখানে কূটনীতির আরেকটি বাস্তব দিক সামনে আসে। রাজনীতিতে টানাপোড়েন থাকলেও ব্যবসা থেমে থাকে না। বরং ব্যবসায়িক যোগাযোগই অনেক সময় রাজনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলানোর পথ তৈরি করে। আবার গতকাল নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেন। তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে তিনি নতুন কোনো তারিখ নিশ্চিত করেননি। তবে বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। সেই সম্পর্ক হবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়ে জয়সওয়াল বলেন, ভারতের অবস্থানে নতুন কিছু নেই। বাংলাদেশের অনুরোধ ভারতের বিদ্যমান প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এই বক্তব্যের গুরুত্ব কম নয়। কারণ, ঢাকা যেখানে দ্রুত পদক্ষেপের কথা বলছে, দিল্লি সেখানে বলছে—প্রক্রিয়া চলছে। দুই পক্ষের ভাষার এই পার্থক্যই এখন মূল সমস্যা।

বাংলাদেশ চাইছে রাজনৈতিক নিশ্চয়তা। ভারত বলছে আইনি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ চাইছে সফরের আগে অনুকূল পরিবেশ। ভারত বলছে সফরের মাধ্যমেই সম্পর্কের পরিবেশ আরও ভালো করা সম্ভব। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর।

কয়েক দিন আগেও সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়ে আলোচনা ছিল। ২১ আগস্টকে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়ার কথাও এসেছে গণমাধ্যমে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বা ভারত—কেউই তা চূড়ান্ত করেনি। ভারতের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে; তবে সফরের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য থাকলে তা জানানো হবে।

এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের ১২ ও ১৩ তারিখে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের প্রসঙ্গও রয়েছে। ওই সম্মেলনের সম্প্রসারিত অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। ফলে সামনে একাধিক কূটনৈতিক জানালা খোলা। কিন্তু কোন জানালা দিয়ে সম্পর্ক এগোবে, সেটিই এখন প্রশ্ন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু একটি আইনি বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান জড়িয়ে আছে।

অন্যদিকে ভারতের কাছে বিষয়টি একটি জটিল আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্ন। তাই নয়াদিল্লি এখনো বলছে, বাংলাদেশের অনুরোধ নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে। এখানেই দুই দেশের কূটনীতির পরীক্ষা। তারেক রহমানের সফর যদি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে পুরোপুরি একসূত্রে বাঁধা থাকে, তাহলে সফরটি আটকে যেতে পারে। আবার সফরটি যদি সেই বিষয় থেকে পুরোপুরি আলাদা করা হয়, তাহলে ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। ফলে তারেক রহমানের দিল্লি যাওয়া এখন শুধু একটি বিদেশ সফরের প্রশ্ন নয়। এটি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরির প্রশ্নও।

ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের বক্তব্যে সেই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। বীণা সিক্রি বলছেন, শর্ত দিয়ে সফর আটকে রাখা ঠিক নয়। বিদ্যা ভূষণ সোনি বলছেন, সফর হলে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। দীনেশ ত্রিবেদী বলছেন, প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে স্বাগত জানাতে ভারত প্রস্তুত। শামা ওবায়েদ বলছেন, এখনো সফরের কোনো নতুন খবর নেই। আর রণধীর জয়সওয়াল বলছেন, ভারত ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক চায়। পাঁচটি বক্তব্য। পাঁচটি জায়গা। পাঁচটি কণ্ঠ। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি না। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, গেলে তিনি কী নিয়ে যাবেন?

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি? হাদি হত্যার আসামিদের হস্তান্তরের দাবি? তিস্তার পানি? বাণিজ্যের ভারসাম্য? সীমান্ত? জ্বালানি? নাকি সবকিছু মিলিয়ে নতুন এক সম্পর্কের হিসাব? ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্কের পুরোনো কাঠামো আর আগের জায়গায় নেই। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান, তার ভারতে অবস্থান এবং নতুন সরকারের চীনসহ অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কের সমীকরণ বদলেছে। তাই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও নিছক সৌজন্য সফর হবে না। এটি হবে দুই দেশের নতুন সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা।

দিল্লি চাইবে, সফর দিয়ে বরফ গলুক। ঢাকা চাইবে, সফর যেন শুধু ছবির অনুষ্ঠান না হয়। আর দুই দেশের সাধারণ মানুষ চাইবে, কূটনীতির উত্তাপ যেন শেষ পর্যন্ত তাদের জীবনকে আরও কঠিন না করে। বরং বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত, চিকিৎসা ও যোগাযোগে তার সুফল পৌঁছাক। দীনেশ ত্রিবেদীও মঙ্গলবার ঠিক সেই কথাই বলেছেন—এই সফরের সুফল শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। কিন্তু তার আগে দরকার আস্থা। আর সেই আস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন একটিই—শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু এবং তারেক রহমানের ভারত সফরকে দুই দেশ কতটা আলাদা রাখতে পারে।

সফরটি হলে সেটি নতুন সম্পর্কের শুরু হতে পারে। না হলে পুরোনো দূরত্ব আরও দীর্ঘ হতে পারে। এই মুহূর্তে তাই দিল্লির সবচেয়ে আশাবাদী বার্তার পাশেই ঢাকার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে। দুই পক্ষই বলছে, দরজা খোলা। কিন্তু কে আগে দরজায় পা রাখবে—সিদ্ধান্তটি এখনো হয়নি।