Image description

৫ আগস্ট ২০২৪। দেশের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব দিন। একদিকে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রজুড়ে দ্রুত পরিবর্তন। সেই ঘটনার দুই বছর পরও ৫ আগস্টের আগে কী ঘটেছিল, কারা কী জানতেন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র কেন শেষ মুহূর্তে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিতর্ক চলছে। এর মধ্যেই পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের নেপথ্য নিয়ে বিস্তর তথ্য তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে এসেছে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম। এসেছে ‘ডিপস্টেট’-এর ভূমিকার কথা। এসেছে সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা একটি অংশের কথাও।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদা ভাট্টির ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০২৩ সালের মার্চে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। সেখানে ২০২৪ সালে একটি নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। সম্ভাব্য সরকার কাঠামোর একটি রূপরেখাও ছিল প্রতিবেদনে।

মনিরুলের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনে যাদের নাম ছিল, তাদের কয়েকজন পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়েছেন। কেউ হয়েছেন বিভিন্ন কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্য। এমনকি কয়েকজন সংবাদপত্রের সম্পাদকের নামও প্রতিবেদনে ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

মনিরুল বলেন, তার দেওয়া প্রতিবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা ছিল। তবে তখন তিনি বিষয়টিকে ‘জাতীয় সরকার’ হিসেবে দেখেছিলেন। তার ধারণা ছিল, বয়সের কারণে ড. ইউনূস সরাসরি নেতৃত্বে নাও থাকতে পারেন। তার পরিবর্তে অন্য কাউকে সামনে আনা হতে পারে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা প্রতিবেদনের ওই অংশ পড়ে ভিন্ন মত দিয়েছিলেন। তিনি তাকে বলেছিলেন, ড. ইউনূস নিজেই ক্ষমতায় যেতে চাইবেন। মনিরুলের ভাষায়, শেখ হাসিনা তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি চিনো না ওনারে।’ এরপর ড. ইউনূসকে নিয়ে শেখ হাসিনার কঠোর মন্তব্যের কথাও সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা পুরো সাত-আট পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি পড়েছিলেন। প্রতিবেদনের বেশির ভাগ বিষয়েও তিনি একমত হয়েছিলেন। তবে ড. ইউনূসের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে তার ধারণা ছিল আরও স্পষ্ট। সাক্ষাৎকারে মনিরুল আরও বলেন, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগেও তিনি একটি প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। তার বক্তব্য, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি আগে থেকেই তথ্য পেয়েছিলেন। এমনকি কোন কোন দেশ এতে যুক্ত হতে পারে, সে বিষয়েও প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল।

মনিরুল বলেন, পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তিনি পুরোনো প্রতিবেদনটি উদ্ধার করেন। সেটি মিলিয়ে দেখার পর তার মনে হয়েছে, প্রতিবেদনের প্রায় ৯০ শতাংশ তথ্য পরে বাস্তব ঘটনার সঙ্গে মিলে গেছে।

তবে এসব বক্তব্যের কোনো স্বাধীন প্রমাণ তিনি সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেননি। তার বক্তব্যের বড় অংশই তার নিজের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়কার প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণের বর্ণনা।

৫ আগস্টের আগে সরকারের প্রস্তুতি নিয়েও মনিরুল ইসলাম বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি ও জামায়াতের সমাবেশকে ঘিরে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হওয়ায় সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।

এরপর ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়ে যায়। মনিরুলের ভাষায়, নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর সরকার ও সরকারি দলের মধ্যে একধরনের আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল। আন্দোলন হলেও তা কয়েক বছর পর, অর্থাৎ সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে হবে—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল।

‘গা ছেড়ে দিয়েছিল’—সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুলও প্রায় একই কথা বলেন। তার মন্তব্য, এই আত্মতুষ্টিই পরবর্তী সময়ে বড় ভুল হয়ে দাঁড়ায়। এরপর তিনি আরও পেছনে যান। তার বক্তব্য, সরকারের পরিবর্তনের পরিকল্পনা ২০১৯ সালের পর থেকে নতুন মাত্রা পায়। এ ক্ষেত্রে তিনি ‘ডিপস্টেট’ বা রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা প্রভাবশালী অনানুষ্ঠানিক শক্তির কথা বলেন।

মনিরুলের মতে, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং তার আগের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও কোটা আন্দোলনকে একধরনের ‘পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র’ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তার ভাষ্য, প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয়—এমন ধারণা তৈরি হওয়ার পর ছাত্র ও তরুণদের কাজে লাগানোর কৌশল নেওয়া হয়।

তবে ‘ডিপস্টেট’ সম্পর্কে মনিরুল নিজেই বলেন, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্রের কোনো স্বীকৃত কাঠামোর নামও নয়। বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সমন্বিত প্রভাবকে বোঝাতে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

সবচেয়ে গুরুতর দাবি এসেছে সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে। মনিরুলের ভাষ্য, ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পেছনে সেনাবাহিনীর একটি অংশের ভূমিকা ছিল। তিনি দাবি করেন, সরকারের আন্দোলন দমনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর একটি অংশ ‘পেছন থেকে ছুরিকাঘাত’ করেছে। তার যুক্তি, ৫ আগস্টের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও তিন বাহিনীর প্রধানেরা তাদের পদে থেকে যান। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালকও বহাল ছিলেন। মনিরুলের দাবি, এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে একটি আলাদা প্রভাবশালী বলয় কাজ করছিল।

তিনি এই বলয়কে ‘মিনি ডিপস্টেট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার দাবি, এই বলয় সব সময় সরকারের পক্ষে কাজ করে না। কখনো সরকারের পক্ষেও কাজ করে, আবার কখনো সরকারের বিরুদ্ধেও সক্রিয় হতে পারে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীর সঙ্গে কথিত মূল ‘ডিপস্টেট’-এর যোগাযোগ ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, মনিরুল ইসলামের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি এমন একজন কর্মকর্তা, যিনি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের আগে পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান ছিলেন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্যের একটি বড় অংশ তার দপ্তরের মাধ্যমে প্রবাহিত হতো। ফলে তার দাবি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—৫ আগস্ট কি কেবল রাজপথের আন্দোলনের ফল, নাকি এর পেছনে আরও বিস্তৃত কোনো রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া কাজ করেছিল?

মনিরুল ইসলামের বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্য শেখ হাসিনাকে ঘিরে। তার দাবি সত্য হলে, ২০২৩ সালেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তনের একটি পরিকল্পনার আভাস পেয়েছিলেন। তিনি তার গোয়েন্দা প্রধানের দেওয়া প্রতিবেদন পড়েছিলেন। ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কও হয়েছিলেন। কিন্তু সতর্কতার পরও কেন রাষ্ট্রযন্ত্র প্রস্তুত থাকতে পারল না—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

৫ আগস্টের কয়েক দিন আগে পর্যন্ত সরকারের দৃশ্যমান অবস্থান ছিল শক্ত। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামো—সবই ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অথচ ৫ আগস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, দেশত্যাগ এবং সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।

এই দ্রুত পতনের ব্যাখ্যায় মনিরুল এখন যে বয়ান দিচ্ছেন, তাতে রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভেতরের দ্বন্দ্বও সামনে আসছে। তার দাবি অনুযায়ী, বাইরে ছিল আন্দোলন। ভেতরে ছিল ভিন্ন হিসাব। আর শেষ মুহূর্তে সেই দুই স্রোত এক জায়গায় এসে মিশেছিল। মনিরুল ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সাক্ষাৎকারটির ভিডিওর লিংক শেয়ার করেছেন। এর ফলে তার বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে।

দেশের রাজনীতিতে ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিন নয়, এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর এক বড় ভাঙনের দিন। সেই ভাঙনের ভেতরে কী ছিল, কারা কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন এবং কে কোন চাল চালছিলেন—তার পূর্ণ উত্তর এখনো অজানা।

মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার সেই অন্ধকার ঘরে নতুন কয়েকটি প্রশ্নের আলো ফেলেছে। কিন্তু প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে আরও বড় প্রশ্নও। সত্যিই কি ২০২৪ সালের পরিবর্তনের নকশা ২০২৩ সালেই আঁকা হয়েছিল? সত্যিই কি শেখ হাসিনা সেই নকশার খবর পেয়েছিলেন? আর যদি পেয়ে থাকেন, তবে কেন শেষ পর্যন্ত তার সরকার নিজেই নিজের দুর্গ রক্ষা করতে পারল না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচিত অধ্যায়টিকে নতুন করে লিখবে।