সোমবার ভোর; মৃদু কেঁপে উঠল রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা। কাঁপন মৃদু হলেও বিশেষজ্ঞরা একেই নিচ্ছেন বিশেষ সতর্কতা হিসেবে। কারণ, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর শিবপুর! গত বছর ২১ নভেম্বর সেই নরসিংদী থেকে সৃষ্ট কম্পনে কেঁপে উঠেছিল ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। দুলে উঠেছিল ভবন, আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছিল শহরের মানুষ। ঢাকা ও নরসিংদীতে নিহত হয়েছিল ১১ জন। আহত হয়েছিল কয়েকশ মানুষ।
অবশ্য সোমবারের মৃদু কম্পনে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তারপরও সেটিতে বড় ভয়ের কারণ, চলতি বছর দেশে যে ১৩টি মৃদু থেকে মাঝারি আকারের ভূমিকম্প হয়েছে, সেগুলোর একাধিকের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। সে কারণে এখন সামনে এসেছে কয়েকটি প্রশ্ন— নরসিংদীর মাটির নিচে কি সক্রিয় ফল্ট আছে? এই ফল্ট কি ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েনসের সাম্প্রতিক এক গবেষণার প্রাথমিক অনুসন্ধানে মিলেছে সে শঙ্কারই ইঙ্গিত।
গবেষকরা বলছেন, ‘নরসিংদীর এ ফল্ট থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’ অবশ্য, শিগগির এমন ভূমিকম্প হবে তেমন না ভাবার পরামর্শও দিলেন তারা। পাশাপাশি বললেন, নরসিংদীর এ ভূমিকম্প নতুন করে সতর্ক করেছে। বাংলাদেশে ভূগর্ভে থাকা ভূমিকম্পের উৎসগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। পাশাপাশি ভূমিকম্পের ঝুঁকিও নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার।
মাটির ২৫ কিলোমিটার নিচে ভূমিকম্পের উৎস: গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল নরসিংদী শহরের প্রায় ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ঢাকা থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। ভূমিকম্পটি একটি রিভার্স বা থ্রাস্ট ফল্টের কারণে হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। সহজভাবে বললে, ভূগর্ভে দুটি ভূত্বকীয় অংশের মধ্যে চাপ সৃষ্টি হয়ে একটি অংশ অন্য অংশের ওপর উঠে যাওয়ার ফলে ভূমিকম্পটি সৃষ্টি হয়েছে।
গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েনস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, “এই ভূমিকম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, ফল্টটির কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন মাটির ওপরে পাওয়া যায়নি। এ কারণেই আমরা এটিকে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বলে থাকি।”
ভূমিকম্পে যে অংশ ভেঙেছে, তা মাত্র পাঁচ কিলোমিটার: গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫ দশমিক ৪৪ মাত্রার ভূমিকম্পের সময় ভূগর্ভে যে অংশে ভাঙন বা রাপচার হয়েছে, তার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার। প্রস্থ প্রায় ৪ দশমিক ১৭ কিলোমিটার। মোট রাপচার এলাকা প্রায় ২২ বর্গকিলোমিটার।
ড. জিল্লুর রহমান বললেন, বর্তমান ভূমিকম্পে হয়তো ফল্টের মাত্র পাঁচ কিলোমিটার অংশ ভেঙেছে। কিন্তু পুরো ফল্টটি ৩০ কিলোমিটার বা তারও বেশি দীর্ঘ হতে পারে। তার ব্যাখ্যা, পাঁচ কিলোমিটার অংশ ভাঙলে যে মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বড় অংশ একসঙ্গে ভেঙে গেলে ভূমিকম্পের মাত্রাও অনেক বেড়ে যেতে পারে।
নরসিংদীর ফল্ট থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে?: ড. জিল্লুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, নরসিংদীর এই ফল্ট থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হবেই— এমন কোনো দাবি করা হচ্ছে না। তবে তিনি জানালেন, বাংলাদেশের ভেতরে এবং আশপাশের এলাকায় অতীতে বড় ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। ১৮৮৫ সালে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গল এলাকায় ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। ১৮৯৭ সালের গ্রেট ইন্ডিয়ান অঞ্চলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এ ছাড়া ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পেরও ঐতিহাসিক রেকর্ড রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভেতরে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকি আছেই— এমনটা বলা যায় না।
তিন প্লেটের সঙ্গেও যুক্ত নরসিংদীর ফল্ট: গবেষণার ফল অনুযায়ী, নরসিংদীর সম্ভাব্য ফল্টটি পূর্ব-পশ্চিম বরাবর বিস্তৃত এবং দক্ষিণ দিকে হেলে থাকা একটি রিভার্স বা থ্রাস্ট ফল্ট। এটি আঞ্চলিক ভূতাত্ত্বিক চাপের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ ভারতীয় ও বার্মা প্লেটের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এসব প্লেটের পারস্পরিক চাপ ও নড়াচড়ার কারণে এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ভেতরেও প্লেট বাউন্ডারির বাইরে কিছু স্থানীয় ফল্ট রয়েছে। নরসিংদীর এই ফল্টও তেমন বলে মনে করেন গবেষকরা।
ড. জিল্লুর রহমানের মতে, বাংলাদেশের ভূমিকম্পপ্রবণতার অন্যতম কারণ হলো কয়েকটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগ ও প্রভাববলয়ের কাছাকাছি অবস্থান করা। এ অঞ্চলে ভারতীয় প্লেট, বার্মা বা মিয়ানমার প্লেট এবং ইউরেশীয় প্লেটের পারস্পরিক চাপ ও গতিবিধি ভূগর্ভে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি সঞ্চয় করছে।
তিনি বলেছেন, ‘এই প্লেটগুলোর পারস্পরিক চাপের কারণে শুধু প্লেটের সীমানাতেই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন ছোট-বড় ফল্ট বা ভূচ্যুতি তৈরি হয়েছে। নরসিংদীর নিচে যে সম্ভাব্য ফল্টের সন্ধান মিলেছে, সেটিও ওই বৃহত্তর টেকটনিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আমরা আপাতত ধারণা করছি।’
ঢাকা শহরের আশপাশেও ফল্ট?: ড. জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘ঢাকা শহরের নিচে বা আশপাশেও ফল্ট থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এখনো সেগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করা হয়নি।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ‘২০০১ সালে বুড়িগঙ্গা নদীর কাছাকাছি এলাকায় ভূমিকম্প হয়েছিল। তখন কারাগার থেকে অনেক মানুষ আতঙ্কে বের হতে গিয়ে আহত হন। ঢাকার আশপাশে গত ১০০ থেকে ২০০ বছরে ছোট ছোট ভূমিকম্পের রেকর্ড পাওয়া গেলেও সেগুলোর উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। তাই ঢাকার নিচে বা আশপাশে ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে এমন কোনো উৎস আছে কি না, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
দায়িত্ব নিতে হবে জিওলজিক্যাল সার্ভেকে: ড. জিল্লুর রহমান বললেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফল্ট নিয়ে এ ধরনের গবেষণা নিয়মিত হয়। কোন ফল্ট কত মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে, কত বছর পর তা সক্রিয় হতে পারে এবং পুরো ফল্টের আংশিক বা পুরো ফল্ট ভেঙে গেলে কত মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের গবেষণা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
দরকার নিয়মিত মহড়া, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি: বাংলাদেশে যদি শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কেমন হবে জানতে চাইলে ড. জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পাশাপাশি ভবনধস, অবকাঠামোগত বিপর্যয়, বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হতে পারে।
জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ভুটান, সিকিম কিংবা মিয়ানমারে নিয়মিত ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়। এসব ছোট ভূমিকম্প অনেক ক্ষেত্রেই বড় ভূতাত্ত্বিক উৎসের ইঙ্গিত বহন করে।
তার ভাষ্য, ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য শুধু যন্ত্রপাতি কিনে রাখলেই হবে না। নিয়মিত মহড়া, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজ, আবাসিক এলাকা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর নিয়মিত ড্রিল পরিচালনা করতে হবে। জাপান আজ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটি কয়েক দশকের ধারাবাহিক প্রস্তুতি ও অনুশীলনের ফল।