‘এরই মধ্যে বিনিয়োগের একটি ব্যাপক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। এজন্য জ্বালানি খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির বদলে আত্মনির্ভর জ্বালানি নীতি তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যদিও সমস্যাটা রাতারাতি সমাধান করার মতো জায়গায় নেই।’
সরকারের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মফিজুল সাদিক।
জাগো নিউজ: বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বিগত ১৮০ দিনের কাজে সরকার কতটুকু খুশি?
জোনায়েদ সাকি: সরকার তো জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিন থেকেই তার সর্বাত্মকভাবে এই গুরু দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সবাই দায়িত্ব পালন করতে সচেষ্ট। তিনি নিজেও কাজ করে যাচ্ছেন।
সরকার প্রথমে মনোযোগ দিয়েছে তার নির্বাচনি অঙ্গীকারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য। আপনারা এরই মধ্যে জানেন যে সবগুলো ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম যেমন- ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম সাহেবদের ভাতা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কাজ, খাল খননসহ যত ধরনের কাজ আছে সবই শুরু করে দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি
পাইলটভিত্তিতে শুরু হয়েছিল, এখন বাজেট ঘোষণার পরে এটা এই অর্থবছরে বড় আকারের বাস্তবায়ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেগুলো শিগগির বাস্তবে মাঠে চলে যাবে। বাজেট একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। তার আগে আমরা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে একটা পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলপত্র তৈরি করেছি। সেই আলোকে আমাদের সেক্টর প্ল্যানগুলো তৈরি করার কাজ চলছে।
জাগো নিউজ: কোন প্রকল্পগুলো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?
জোনায়েদ সাকি: মন্ত্রণালয়ভিত্তিক যে প্রকল্প তৈরি হয় সেগুলো আমরা পুনঃসজ্জিত করার চেষ্টা করছি। মন্ত্রণালয়গুলো নির্বাচনি ইশতেহার মেনে কাজ করবে। আমাদের যে পঞ্চবার্ষিক কৌশলপত্র রয়েছে তার প্রতিফলন ঘটাবে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রকল্পগুলোও ‘কর্মসূচিভিত্তিক একগুচ্ছ প্রকল্প’- এভাবে ঠিক করার চেষ্টা করছি, যাতে আমরা কার্যকর ফলাফলটা পাই। সবচেয়ে ভালো ফলাফলটা নিতে পারি- এমন একটি কর্মসূচি নিচ্ছি।
আমরা যখন বাস্তবায়ন করতে যাই তখন দেখি এটা জনগণের জন্য কতটা মঙ্গলজনক। সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কী কী প্রয়োজন, সে অনুযায়ী প্রকল্পগুলো কীভাবে সাজানো যায়- সে কাজ করছি। যখন বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়া হয় তখন তার সর্বোচ্চ লক্ষ্যটা অর্জিত হয় না। তো সেভাবে পুরো পরিকল্পনাটা নতুন করে সাজানোর চেষ্টা চলছে। এর বাইরে প্রকল্প বাস্তবায়ন সবচেয়ে বড় সমস্যা, যেটা আমাদের কৌশলপত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ- সে কাজ করতে হবে।
জাগো নিউজ: বারবার প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে। ফলে জনগণ সঠিক সময়ে উপকার পাচ্ছে না। আবার রাষ্ট্রের অর্থও অপচয় হচ্ছে।
জোনায়েদ সাকি: প্রকল্পের সময় বাড়া মানেই অর্থ বাড়া। এখন নির্দিষ্ট ব্যয় ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন যাতে আমরা করতে পারি সেজন্য কাজ করছি। বাস্তবায়নের যত রকম পথ আছে, বিভিন্ন স্তর আছে, সেগুলোর মধ্যে কীভাবে সময় কমানো যায় সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, জমি অধিগ্রহণ কিংবা অটোমেশনের সমস্যার কারণে নানা দিক থেকে প্রকল্প আটকে থাকে কিংবা কিছু প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা আছে। ওই পুরো প্রক্রিয়াটাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি
প্রকল্পের প্রত্যেকটি পর্বে যাতে সময় কমানো যায়, সে অনুযায়ী নীতিমালার পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আশা করি ১৮০ দিনের মধ্যে আমরা শেষ করে ফেলতে পেরেছি। আমরা একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করার চেষ্টা করছি। এই ড্যাশবোর্ডের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রকল্পগুলো যেন প্রতি মুহূর্তে মনিটর করা যায়। আমাদের মন্ত্রীরা যাতে এটা মনিটর করতে পারেন সে ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
জাগো নিউজ: ১৮০ দিনে আর কোন কোন কাজ গুরুত্ব দিয়েছেন?
জোনায়েদ সাকি: আমরা এসডিজি অর্থাৎ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করছি। কেননা ২০৩৪ সালের মধ্যে এই সরকার ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে উন্নীত করবে। এই সরকারের মেয়াদে যেমন সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জন করার ব্যাপার আছে, তেমনি ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন করারও একটি সময়সীমা আন্তর্জাতিকভাবে আছে।
সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন- সামাজিক সুরক্ষা থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ পুরো উৎপাদনশীল একটি কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ। একটি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়া হবে, যেখানে অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষেত্রকে অনেক বেশি বহুমুখীকরণ করা হচ্ছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। যার মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনীতি আরও সম্প্রসারিত হবে। বড় আকারে তৈরি হবে কর্মসংস্থান। এই জায়গাগুলো যেহেতু ফোকাস করা হচ্ছে, সে কারণে এই পুরো পরিকল্পনা সাজানোর চেষ্টা চলছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি
আর্থিক খাত ব্যাপকভাবে সংস্কার করে একে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে সহজীকরণ হয়, সাশ্রয়ী হয় তার জন্য নানান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি সিঙ্গেল উইন্ডোর মাধ্যমে যাতে মানুষ হয়রানিমুক্তভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে বা উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারে সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।
তরুণরা যাতে স্টার্টআপে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্যোগ নিতে পারে, উদ্যোক্তা হতে পারে তার জন্য ব্যাপকভাবে একটা পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
জাগো নিউজ: যোগাযোগ ব্যবস্থায় কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
জোনায়েদ সাকি: রেল, নৌপথ ও সড়কে ব্যাপকভাবে কাজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে রেল ও নৌপথে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ এসব পথে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে চলাচল করতে পারেন। ফলে সে জায়গাটা আমরা তৈরি করার চেষ্টা করছি।
১৮০ দিনে কী করেছি তার একটি প্রতিবেদন নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে প্রকাশিত হবে। যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল সেটার অনেকদূর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও তার নিজের যে চেষ্টা সেটা পুরো সরকারের মধ্যেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
জাগো নিউজ: প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে অনিয়ম করা যায়। এটা বন্ধে কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
জোনায়েদ সাকি: প্রকল্পের ডিপিপি সঠিকভাবে প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা দুটি জিনিস করছি। প্রথমত, রেট শিডিউলে হাতে দিয়েছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রকম রেট শিডিউল আছে। সেগুলোকে সমন্বিত রেট শিডিউলে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। এক রেট শিডিউল অনুযায়ী যাতে প্রত্যেকটি জিনিস তৈরি হয়। এটি তৈরি করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে বা এআই সহায়তা নিয়ে সেগুলো পরীক্ষা করা হবে।
দ্বিতীয়ত, রেট শিডিউলের বাইরেও বেশকিছু খাত আছে। যেখানে নানাভাবেই অর্থ বরাদ্দের কথা আমরা আগে শুনেছি। সেগুলো যথাসম্ভব চিহ্নিত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে একটি তালিকা তৈরি করেছি। সেটার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট সেক্টরগুলো নির্দেশনা দিয়েছি। ফলে প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন সময়ের মধ্যে আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি সেটার উদ্যোগ নিচ্ছি, একই সঙ্গে এটা যাতে সাশ্রয়ী হয় এবং জনগণের অর্থ লোপাটের ব্যবস্থা যেন বন্ধ করা যায়, সেটার জন্যও আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।
জাগো নিউজ: আইএমইডি দায়সারা প্রতিবেদন তৈরি করে বলে অভিযোগ আছে। প্রকল্পের সঠিক তদন্ত করতে আইএমইডিকে নির্দেশ দেওয়া হবে কি?
জোনায়েদ সাকি: এরই মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছি। যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে অবহেলা করা হয়েছে, সেগুলো তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে।