Image description

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাহতাব। রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে বাড়ি থেকে কলেজে গিয়েছিলেন পরীক্ষা দিতে। এরপরই মাহতাবের বাবার মোবাইল ফোনে কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে পুুুলিশ পরিচয়ে বলা হয়, ‘আপনার ছেলে ইয়াবাসহ আটক হয়েছে। তাকে ছাড়াতে হলে দ্রুত টাকা পাঠান।’

ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে শুধু কান্নার আওয়াজ শোনানো হয়। পুলিশের ওয়্যারলেস সেটের শব্দও আসে। টাকা পাঠাতে দেরি হলে ছেলেকে আদালতে চালান করা হবে বলেও ভীতি দেখায় অপর প্রান্তের ব্যক্তি। পরিবারের ‘সম্মান’ আর ছেলের ‘ভবিষ্যতের’ কথা চিন্তা করে ‘পুলিশের’ দেওয়া চারটি নম্বরে ধাপে ধাপে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পাঠান স্কুলশিক্ষক বাবা। রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুরে কুড়িগ্রামের উলিপুরে এ ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী কলেজশিক্ষার্থী মাহতাবের বাবা জেলার উলিপুর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ‘ছেলের পরীক্ষা দেওয়া হবে না, ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে, পরিবারের সম্মানও থাকবে না’-এমন নানা আশঙ্কার কথা চিন্তা করে ঘটনার আকস্মিকতায় ফোনকারীর প্রতারণা বুঝতে পারেননি স্কুলশিক্ষক বাবা। প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে ঋণ করে নিমিষেই দেড় লক্ষাধিক টাকা দিয়ে দেন প্রতারকদের বিকাশ নম্বরে।

ওই স্কুলশিক্ষক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল। আমি স্কুলে ছিলাম। দুপুর ১২টার দিকে একটা ফোন আসে। পুলিশ পরিচয় দিয়ে বলে যে ছেলে মাদকসহ আটক করা হয়েছে। ছাড়াতে চাইলে টাকা দিতে হবে। আমি ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে শুধু কান্নার আওয়াজ শোনানো হয়। দেরি হলে বলে, “এসপি স্যার জানছে, মিডিয়া জানছে। বেশি করে টাকা পাঠাতে হবে।” আমি দিশাহারা হয়ে ধার করে টাকা পাঠিয়ে দিই। পরে পরীক্ষা শেষে ছেলে ফোন করলে বুঝতে পারি আমি প্রতারণার শিকার হয়েছি। আসলে ছেলেকে কেউ আটক করেনি। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। নম্বরগুলো বন্ধ।’

গত ৬ আগস্ট কুড়িগ্রাম সদরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ফোন করে বলা হয়, ‘আপনার ছেলে ইয়াবাসহ আটক হয়েছে। ছাড়াতে চাইলে দ্রুত এই নম্বরে ৩০ হাজার টাকা পাঠান।’ পাশে শোনা যাচ্ছিল পুলিশের ওয়্যারলেস সেট আর গাড়ির ইমারজেন্সি সাইরেনের আওয়াজ। স্কুলশিক্ষক মা একটু সময় নিয়ে টাকা জোগাড় করেন। ততক্ষণে ফোনকারী ‘পুলিশের’ বিল বেড়ে যায়।

 

‘এসপি স্যারের নলেজে গেছে। সঙ্গে মিডিয়ার লোকজন জেনে গেছে। সব সামলাতে আরও টাকা দিতে হবে।’ বলেন ফোনকারী। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা উত্তোলন করে দিয়ে দেন স্কুলশিক্ষক মা। ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্রটি। এরপর ফোন বন্ধ।

একই দিন সদরের আরেকটি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষককেও ফোন দেয় চক্রটি। নাটকের স্ক্রিপ্ট একই। ওই প্রধান শিক্ষকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে ‘ইয়াবাসহ ধরা পড়েছে’ বলে তাকে ছাড়ানোর শর্তে আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।

কুড়িগ্রামে গত কয়েক দিন ধরে এভাবে একটি চক্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের টার্গেট করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। পুলিশ পরিচয়ে সন্তানদের ‘মাদকসহ আটক করা হয়েছে’ বলে লুটে নেওয়া হচ্ছে এসব অর্থ।

প্রতারণার শিকার এক প্রধান শিক্ষক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফোনকারী চক্রটি আমাদের পরিবারের তথ্য জানে। তারা জেলার সব প্রধান শিক্ষকের মোবাইল নম্বরও জানে। শুধু আমি বা আমরা দুই চার জন নয়। অনেক প্রধান শিক্ষককে পুলিশ পরিচয়ে ফোন দিয়ে একইভাবে সন্তানদের ইয়াবাসহ আটকের কথা বলে প্রতারণা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এই চক্রকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা।’

এই প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকসহ সবাইকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। আর কাউকে যেন এভাবে প্রতারিত হতে না হয়।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি আপনার কাছেই জানলাম। কোনও শিক্ষক আমাকে এখন পর্যন্ত বিষয়টি জানাননি। এটি ভয়াবহ খবর। এ ব্যাপারে শিক্ষকদের সতর্ক করতে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

যেভাবে সতর্ক হবেন

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান দুলু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এভাবে কারও কাছে ফোন গেলে আগে সত্যতা যাচাই করতে হবে। শুধু ফোন পেয়েই বিশ্বাস করা বোকামি। যাকে আটকের দাবি করা হচ্ছে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। কোনোভাবেই টাকা দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে কলরেকর্ড করে দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে হবে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত দ্রুত এই চক্রটিকে খুঁজে বের করা। না হলে অনেকে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশ এই কাজ করছে না এটি শতভাগ নিশ্চিত। এটা প্রতারক চক্রের কাজ। যারা এ ধরনের ফোন পাবেন তারা যেন কোনোভাবে টাকা না দেন। কেউ এমন ফোন পেলে দ্রুত পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ দেবেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা এই প্রতারক চক্রকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনবো।’