Image description
সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে সাধারণত ভ্যাট-ট্যাক্স নেই। কিন্তু তৈরি পোশাক খাতে সাব-কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে শর্ত ভঙ্গ করলেই গুনতে হবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। নতুন এ প্রবিধান জারি করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। এতে বিপাকে পড়েছেন তৈরি পোশাক খাতে ছোট ছোট উদ্যোক্তা। এ শর্তভঙ্গের কারণে এখন শত শত কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

২০২৫ সালে জারি করা এ আদেশ প্রথম দিকে খুব একটা আলোচনায় ছিল না। সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটের অনুমোদন সাপেক্ষে রাপ্তানি পণ্যের সাব-কন্ট্রাক্ট সম্পন্ন না হওয়ায় এখন দিতে হবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। এ ছাড়া বিদায়ী অর্থবছরে অধিকাংশ সাব-কন্ট্রাক্ট্রের ক্ষেত্রে নিয়ম না মানায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কাস্টমস, বন্ড কমিশনারেট। এ ছাড়া সাব-কন্ট্রাক্ট্রে স্থানীয় মুদ্রা বাদ দিয়ে শুধু বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের আদেশে বিপাকে পড়েছেন তৈরি পোশাক খাতের ছোট উদ্যোক্তারা। যার কারণে লোকাল এলসিতে করা সাব-কন্ট্রাক্ট আমলে নিচ্ছে বন্ড কমিশনারেট।

সূত্র জানায়, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তৈরি পোশাক খাতের সাব-কন্ট্রাক্ট সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বেশ কিছু শর্ত বেঁধে দিয়েছে এনবিআর। নতুন শর্তে সাব-কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রা বাদ দিয়ে শুধু বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে বন্ডেড পণ্য অবৈধ অপসারণ বা দাবিনামা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্ট করতে অবশ্যই বন্ড কমিশনারের অনুমতি নিতে হবে। আরও লাগবে ব্যাংক গ্যারান্টি। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকরা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্টে গেলে সংশ্লিষ্ট কমিশনারকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অবহিত করতে হবে। কিন্তু বিদায়ী অর্থবছরে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সাব-কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে এনবিআরের শর্ত পরিপালন করেনি। আর বিষয়টি উদ্বেগজনক বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বন্ড কমিশনারেট। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট থেকে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএকে দেওয়া হয়েছে। বন্ড কমিশনারেটের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কমিশনারের অনুমোদন ও ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া সংগঠনের পক্ষ থেকে (বিজিএমইএ-বিকেএমই) সাব-কন্ট্রাক্ট ইস্যু করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কার্যক্রমহীন ও জেনারেল বন্ডের মেয়াদোত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানেরও সাব-কন্ট্রাক্ট ইস্যুর অভিযোগ রয়েছে। সরকারের এ বিধানটি যথাযথ পরিপালনের জন্য চিঠিতে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন দুটিকে অনুরোধ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, চট্টগ্রামের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞাপনের শর্তভঙ্গ করে দেশীয় মুদ্রায় সাব-কন্ট্রাক্ট ইস্যু করছে। বিষয়টির অনুমোদনও বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ দিচ্ছে। এ ছাড়া কমিশনারের অনুমতি ও ব্যাংক গ্যারান্টির বাধ্যবাধকতা থাকলেও সাব-কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে পরিপালন হচ্ছে না। যার কারণে সংগঠন দুটিকে বন্ড কমিশনারেটের পক্ষ থেকে এনবিআরের এ প্রজ্ঞাপন পরিপালনের অনুরোধ করা হয়েছে।

তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক খাতের অধিকাংশ ফ্যাক্টরি ব্যাংকিং জটিলতার কারণে স্থানীয় মুদ্রায় সাব-কন্ট্রাক্ট ইস্যু করছে। কারও ক্ষেত্রে এলসি পাচ্ছে না, আবার কারও ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ-সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। এ কারণে সাব-কন্ট্রাক্টের শর্ত পরিপালনে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিনিয়ত এনবিআর থেকে জটিল পলিসি নির্ধারণ করা হচ্ছে। যেমন, ব্যাংক গ্যারান্টি ও কমিশনারের অনুমোদন সাপেক্ষে সাব-কন্ট্রাক্ট ইস্যুর শর্ত দেওয়া হয়েছে। যারা ব্যাংকের সহযোগিতা পাচ্ছে না, তারা কীভাবে ব্যবসা করবে। সবাই তো রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এক্ষেত্রে বাধা তৈরি করা মানে হচ্ছে পরোক্ষভাবে রপ্তানি খাতে জটিলতা তৈরি করা। তাই বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যান ও টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব বরাবর সাব-কন্ট্রাক্ট্রের প্রজ্ঞাপন সংশোধন ও সহজ করার জন্য চিঠিও দিয়েছে বিজিএমইএ।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের কারখানাগুলোর যখন অর্ডার থাকে না, তখন পরিচালন ব্যয় নির্বাহের জন্য সাব-কন্ট্রাক্ট্র গ্রহণ করে থাকে। এ ছাড়া বৃহৎ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো লিড টাইমের মধ্যে রপ্তানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়ে থাকে। তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জরুরি চাহিদা মেটাতেও সাব-কক্ট্রাক্ট করে থাকেন রপ্তানিকারকরা। সব মিলে এনবিআরের এই প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে ফের স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন সুযোগ দিয়ে সহজ করার জন্য বলা হয়েছে চিঠিতে।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতে সাব-কন্ট্রাক্টে যারা কাজ করেন সবাই রপ্তানি সঙ্গে জড়িত। আর সাব-কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে সাধারণ প্র্যাকটিস হলো—ক্যাশ লেনদেন। কারণ এই লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে হলে অনেক ক্ষেত্রে যারা সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করে থাকেন, তারা সময়মতো অর্থ পান না। ব্যাংকের লেনদেন বা দেনা-পাওনা থাকলে কেটে রেখে দেয়। এতে কাজ করার পর সঠিক সময়ে শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যায় না। আর বেতন-ভাতা না পেলে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন।’

তিনি বলেন, ‘হুট করে গত অর্থবছর এনবিআর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দীর্ঘদিনের এ চর্চা বাতিল করে দিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন শর্ত আরোপ করেছে। এতে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন চট্টগ্রামের ছোট ও মাঝারি মানের কারখানা মালিকরা। তারা এলসি থেকে শুরু করে ঋণের কারণে ব্যাংকের সহযোগিতা পাচ্ছেন না। চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট থেকে সাব-কন্ট্রাক্ট সংক্রান্ত চিঠি ইস্যুর পর বিষয়টি নিয়ে আমি কথা বলেছি। এরই মধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যান ও টাস্কফোর্সের সদস্য সচিব বরাবর চিঠিও দিয়েছি।’