রাস্তায় সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলা লাল রঙের বড় গাড়িগুলো দেখলেই সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের পাশাপাশি এক ধরনের স্বস্তি ও ভরসা জাগে। যে কোনো দুর্যোগ, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কিংবা দুর্ঘটনায় নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে যারা সবার আগে মানুষের জানমাল রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েন, তারা হলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাহসী সদস্যরা। এই নিঃস্বার্থ বীরত্বের কারণেই ফায়ার সার্ভিস দেশের অন্যতম একটি শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাদের বীরত্বে উজ্জীবিত হয়ে বহু তরুণ ফায়ার ফাইটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
বীরত্বের সেই লাল উর্দি বর্তমানে কিছু অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির কালিমায় ঢাকা পড়ছে। যে প্রতিষ্ঠান মানুষের বিপদে আগুন নেভায়, সেই প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জ্বলছে নিয়োগ বাণিজ্য আর দুর্নীতির শিখা। সম্মান আর শ্রদ্ধার প্রতিষ্ঠান নিজেই দুর্নীতির আগুনে পুড়ছে। নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি সিন্ডিকেট, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগে সংস্থাটি এখন চরম সমালোচনার মুখে। অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পর্যন্ত এই দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েছেন।
গাড়িচালক থেকে কোটিপতি সাখাওয়াত: কালবেলার দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক শক্তিশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের কবলে নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ। সংস্থাটির চতুর্থ শ্রেণির একজন সাধারণ গাড়িচালক হয়েও বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন মো. সাখাওয়াত হোসেন। জালিয়াতির মাধ্যমে এবং ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়ে চাকরিতে ঢোকা এই সাখাওয়াতের সম্পদের পরিমাণ দেখলে বড় বড় শিল্পপতিও লজ্জা পাবেন।
রাজধানীর বছিলার অভিজাত গার্ডেন সিটিতে সাখাওয়াতের রয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট; শেওড়াপাড়ায় ১ হাজার ৪৫০ বর্গফুটের কোটি টাকার ফ্ল্যাট এবং ডেমরায় প্রজেক্ট শেয়ার। তবে তার সম্পদের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী দেখা যায় বরিশালের উজিরপুরে, যেখানে প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর তিনি গড়ে তুলেছেন এক রাজকীয় ডুপ্লেক্স বাগানবাড়ি। স্থানীয়দের মতে, এই বাড়িটি নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
সাখাওয়াত মূলত ফায়ার সার্ভিসের সাবেক এক মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের ‘নিয়োগ সম্রাট’ হয়ে ওঠেন। বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় থাকা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।
বদলি বাণিজ্যের আরেক হোতা উপসহকারী পরিচালক তানহারুল: ড্রাইভার সাখাওয়াতের সম্পদের তথ্য খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. তানহারুল ইসলামের নাম। নিজে উপসহকারী পরিচালক হলেও ড্রাইভার সাখাওয়াতের সঙ্গে তার বেশ সখ্য রয়েছে। সাখাওয়াতের সঙ্গে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে তারও যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাখাওয়াতের মাধ্যমে মোহাম্মদপুর সংলগ্ন বছিলা গার্ডেন সিটিতে রাজধানী বিল্ডার্স নামের এক ভবনের পঞ্চম তলায় একটি ফ্লাট কিনেছেন তানহারুল ইসলাম। ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।
সাখাওয়াতের সঙ্গে সখ্য ও এবং ফ্ল্যাট থাকার কথা অস্বীকার করেছেন তানহারুল ইসলাম। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘সাখাওয়াতের সঙ্গে পরিচয় ছিল তবে কোনো সখ্য নেই। আর ওই বিল্ডিংয়ে আমার কোনো ফ্ল্যাট নেই।’ ৫ তলার ফ্ল্যাটটির মালিক কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওটা আমার ভায়রার।’ নিজের নামে ফ্ল্যাট থাকার তথ্যপ্রমাণ দিলে তিনি ফোন কেটে দেন। এরপর বারবার ফোন এবং মেসেজ দিলেও তিনি আর সাড়া দেননি।
রাজধানী বিল্ডার্সে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তানহারুল ইসলাম নিয়মিত সাখাওয়াতের সঙ্গে ওই ভবনে যাতায়াত করতেন এবং সাখাওয়াতের মাধ্যমেই তিনি ৫ তলার ফ্ল্যাটটি কিনেছেন।
সচিবালয়ে লবিস্ট হিসেবে কাজ করেন ফায়ার ফাইটার সাদ্দাম: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের দুর্নীতির জাল আরও বিস্তৃত। সাদ্দাম হোসেন একজন সাধারণ ফায়ার ফাইটার। অথচ তিনি সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা। সচিবালয়কেন্দ্রিক লবিস্ট হিসেবেও কাজ করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া এক অভিযোগ থেকে জানা যায়, ফায়ার ফাইটার সাদ্দাম হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করে চলছেন। পলাশী ফায়ার স্টেশনে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় তিনি সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতেন না। নিজের কর্মস্থলের বদলে নিয়মিত সচিবালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অবস্থান করতেন এবং সেখান থেকে স্পর্শকাতর নথিপত্র ও তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্টদের কাছে সরবরাহ করতেন। নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে প্রার্থীদের সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেনের অডিও রেকর্ডও বিভিন্ন মাধ্যমে ফাঁস হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাদ্দাম হোসেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে 'মিডিয়াম্যান' হিসেবে প্রভাব বিস্তার করতেন। এভাবে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নিজের একটি ব্যক্তিগত গাড়িও রয়েছে। যার নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ ২৪-৮৩৯২। গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে রাজধানীর দনিয়ার স্মৃতিধারা আবাসন এলাকার ১ নম্বর রোডের ৮/৩ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার সি নম্বর ফ্ল্যাট। তথ্যমতে, এই ফ্ল্যাটটির মালিক তিনি। এর বইারে সাদ্দাম হোসেনের আরও সম্পদ থাকার কথা জানা গেছে। তবে কালবেলা সেই সম্পদের তথ্য যাচাই করতে পারেনি।
চাকরি দেওয়ার নামে একজনের কাছে ১২ লাখ টাকা নেন ফায়ার ফাইটার আশরাফুল: দুর্নীতির এই দীর্ঘ মিছিলে আরেক নাম মো. আশরাফুল ইসলাম। তিনিও সাধারণ ফায়ার ফাইটার। ফাইটার পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ১২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। খুলনার এএম মাহবুব কিবরিয়া নামের এক ব্যক্তিকে ফায়ার ফাইটার পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে তার এবং তার বাবার কাছ থেকে দুই দফায় এই টাকা নেন আশরাফুল। চাকরি দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে আশরাফুল ইসলামকে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠান চাকরিপ্রার্থী মাহবুব কিবরিয়া।
মাহবুব কিবরিয়া ও তার বাবা যে আশরাফুলকে টাকা দিয়েছেন তার দুটি চেকের প্রমাণ পেয়েছে কালবেলা। এতে দেখা গেছে, ২০২২ সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে আশরাফুলকে।
একটি আত্মহত্যা ও দুর্নীতির কালো বিড়াল: ফায়ার সার্ভিসের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সিরাজগঞ্জের সায়দাবাদ পাওয়ার প্লান্ট ফায়ার স্টেশনের গাড়িচালক মো. সিহাব উদ্দিনের আত্মহত্যা। গত ১৯ জুলাই কোয়ার্টার থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সিহাবের পরিবারের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদসূত্রে জানা যায়, কয়েকজনের চাকরির জন্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে সিহাব প্রায় ৮৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু চাকরি না হওয়া এবং ওই কর্মকর্তা টাকা ফেরত না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। ফলে পাওনাদারদের চাপে ও তীব্র হতাশায় সিহাব গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। যদিও অধিদপ্তরের নিজস্ব তদন্তে এ ঘটনার সত্যতা মেলেনি বলে জানা গেছে।
পুলিশের চাকরি বাণিজ্যেও জড়িত কর্মকর্তারা : ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির জাল এখন কেবল নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) নিয়োগ জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রংপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. বাদশা মাসউদ আলম এবং জিরাবো মডার্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার নূরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে এক প্রার্থীর সঙ্গে ১৭ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন এবং জাল প্রবেশপত্র তৈরি করেছিলেন তারা। বাদশা মাসউদের মোবাইল থেকে জাল প্রবেশপত্র ও অর্থ লেনদেনের ডিজিটাল প্রমাণ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রাঘব বোয়ালের নাম উপসচিব আতাহার হোসেন: ফায়ার সার্ভিসের বিরুদ্ধে বারবার এমন অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে বিরক্ত সাধারণ সদস্যরাও। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক সদস্য কালবেলাকে বলেন, নিয়োগ বাণিজ্য তো রয়েছেই, বদলির ক্ষেত্রেও টাকা ছাড়া কাজ হয় না। ফায়ার সার্ভিসের বেশ কিছু সদস্য নিয়োগ এবং বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। তাদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। বারবার অপকর্ম প্রকাশ পেলেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবং ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে সখ্য থাকায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাদের কারণে প্রতিষ্ঠানের দুর্নাম হচ্ছে। নিয়োগ বাণিজ্যসহ অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে কলঙ্কমুক্ত করার দাবি জানান তারা।
ফায়ার সার্ভিসের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এসব অনিয়ম দুর্নীতির প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ঘুরেফিরে উঠে এসেছে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেনের নাম। তিনি ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব কোনো ক্যাডার কর্মকর্তা নন। তিনি মূলত পশুসম্পদ ক্যাডারের একজন উপসচিব। আতাহার হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পশুসম্পদ ক্যাডারের কর্মকর্তার পক্ষে বিগত আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজম ডিও লেটার (সুপারিশপত্র) দিয়েছিলেন।
প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগ দেন আতাহার। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তাকে পরিচালক (প্রশাসন) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি আরও প্রভাবশালী ও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুজন যুগ্ম সচিবকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে সরকারি আদেশ জারি করা হলেও আতাহারের ক্ষমতার দাপটে সেই আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি। এই দুজনকে হটিয়ে পদটি আঁকড়ে রেখেছেন উপসচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা। সর্বশেষ তৃতীয়বারের মতো চলতি বছরের ২ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বদলির আদেশ দেয়। কিন্তু আদেশ জারির মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় গত ৭ এপ্রিল সেই আদেশ বাতিল করে আতাহার হোসেনকে স্বপদে বহাল রাখা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে নিয়োগ কমিটির প্রধান হওয়ায় পরিচালক আতাহার হোসেনই অধিদপ্তরের সব নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক। সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষার্থেই প্রভাব খাটিয়ে বারবার এসব বদলি আদেশ বাতিল করা হয়েছে। তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণির অনেক কর্মচারীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও এ সিন্ডিকেটের মধ্যে স্বার্থের সংঘাতের কারণে কয়েকটি গ্রুপ হয়ে গেছে। যারা এখন নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া।
বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে ঝামেলা: নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের ভেতরে থাকা এসব গ্রুপের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে তৈরি হয় ঝামেলা। স্বার্থে সংঘাত থেকে এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে নামসর্বস্ব বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করে হেনস্তা করার চেষ্টা হয়। অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধেও সংবাদ প্রকাশের হুমকি বা সংবাদ প্রকাশ করে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগও রয়েছে।
ড্রাইভার সাখাওয়াতের সঙ্গে এক নারীর বাগবিতণ্ডা নিজেদের জড়িয়ে সাখাওয়াতসহ সাময়িক বরখাস্ত হন ফায়ার সার্ভিসের দুজন ওয়্যারহাউস পরিদর্শক ও একজন ফায়ার ফাইটার। অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই ট্রেনিং কমপ্লেক্সের ব্যারাকে ফায়ার সার্ভিসের একটি পরিদর্শন কমিটির কাজ চলাকালীন রুমে প্রবেশ করে ড্রাইভার সাখাওয়াতের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া ওই নারী।
পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির সময় নারীর প্রবেশ এবং ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করা নিয়ে ওয়্যারহাউস পরিদর্শক মুহিউদ্দিন এবং ডেমরা ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার কামাল হোসেনের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন আরেক ওয়্যারহাউস পরিদর্শক রেজায়ে রাব্বি। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত রেজায়ে রাব্বী, মুহিউদ্দিন, কামাল হোসেন এবং সাখাওয়াতকে সাময়িক বরখাস্ত করে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগ বদলিকৃত স্টেশনে যোগদান না করে ঢাকা অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
ঘুরেফিরে শুধু ঢাকাতেই তারা: ফায়ার সার্ভিসের এমন প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বেশ কিছু কর্মকর্তার দীর্ঘদিন ধরে এক পদে কর্মরত থাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাকরিবিধির ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা ১৫-২০ বছর ধরে ঘুরেফিরে শুধু ঢাকাতেই কর্মরত রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম সিনিয়র স্টাফ অফিসার মো. শাহজাহান সিকদার। বর্তমানে তিনি মিডিয়া সেলের দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া বর্তমান ডিজির স্টাফ অফিসার শামস আরমানও দীর্ঘ বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। দীর্ঘদিন অধিদপ্তরে থাকায় দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে তাদের সখ্য গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই তালিকায় রয়েছেন সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান। তিনিও দীর্ঘদিন ঢাকাতেই চাকরি করছেন।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি শুধু অধিদপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিছু দিন আগে ফায়ার সার্ভিসের ভোলার উপ-সহকারী পরিচালক লিটন আহম্মেদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়া ফায়ার লাইসেন্স ও সরঞ্জাম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়ে লিটনকে আটকে রাখে, পরে দৌলতখান উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান তাকে উদ্ধার করেন। পরবর্তী সময়ে তাকে ভোলা জেলার বাইরে দ্রুত বদলির সুপারিশ করেন ইউএনও। এ ছাড়া লিটনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে স্টেশনের জ্বালানি নিজে উত্তোলন করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি মহাপরিচালক বরাবর লিটনের বিরুদ্ধে এক ফায়ার ফাইটার তার স্ত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ দিয়েছেন।
যা বললেন মহাপরিচালক: সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল কালবেলাকে বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি সম্পূর্ণ একটা দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ দেওয়ার জন্য এবং সেই প্রচেষ্টা চলমান আছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনো গ্রুপিং বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, এরই মধ্যে ড্রাইভার সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। একইভাবে চালক সিহাব উদ্দিনের আত্মহত্যার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। এটি একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
মুহাম্মদ জাহেদ কামাল আরও বলেন, কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কিছু করে থাকলে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছু সদস্যের জন্য ফায়ার সার্ভিসের সুনাম নষ্ট হোক, এটা আমরা চাই না।
পরিচালক আতাহার হোসেনের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, এ বিষয়টায় মনে হয় আমি সংশ্লিষ্ট না। এটা মন্ত্রণালয়ের বিষয়। তার নিয়োগ বা বদলির বিষয় মন্ত্রণালয় দেখে। তারাই ভালো বলতে পারবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের বক্তব্য: মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, আগে কী হয়েছে সেটা আমার জানা নেই। আগে ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ নিয়ে অনেক প্রতিবেদন (সংবাদপত্রে প্রকাশিত) পাঠক হিসেবে দেখেছি। আমরা এটা (অনিয়ম) বন্ধ করতে চেষ্টা করেছি। নিয়োগে স্বচ্ছতা আনার জন্য পরীক্ষার সময় ভিডিও করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম যাতে না হয়, সেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। এরপরও যদি দুর্নীতি হয় সেটা খুবই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। অভিযোগ এলে অবশ্যই যাচাই করা হবে। কারও বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।