দেশে চলমান ভয়াবহ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে একটি ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ গঠনের পরামর্শ দিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, এখন আর ধীরে ধীরে সমস্যা সমাধানের সময় নেই; দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য এলএনজির মতো ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এখনই বিকল্প ও নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকতে হবে। এদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে সিপিডির এক গবেষণায় উঠে এসেছে। রোববার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে এসব তথ্য জানানো হয়।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এখন একদিকে ফায়ার ফাইটিংয়ের সময়। প্রতিদিন অপেক্ষা করার বা ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো সমাধান হবে-এমন পরিস্থিতি আর নেই। জ্বালানি খাতের সমস্যাগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ জ্বালানি অবকাঠামো গ্যাসনির্ভর। এর পাশাপাশি ডিজেলের ওপরও ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে গ্যাস সরবরাহ করায় শিল্পকারখানাগুলোও গ্যাসনির্ভর হয়ে পড়ে। পোশাক কারখানার বয়লার, সার উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে।
কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে উল্লেখ করে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, গ্যাসের মজুত শেষের দিকে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের কাজও প্রত্যাশিত গতিতে শুরু হয়নি। ফলে সবাই বিকল্প হিসাবে দ্রুত এলএনজির দিকে যাচ্ছে। তবে এলএনজি বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। সাময়িক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অবশ্যই এই ব্যয়বহুল জ্বালানি দিয়ে সম্ভব নয়। এখনই বিকল্প জ্বালানিনির্ভর শিল্প ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
শিল্পকারখানায় বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে প্রতিস্থাপন, গাড়িতে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে ইলেকট্রিক ভেহিকলে যাওয়া এবং শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে ডিজেলের বিকল্প হিসাবে সৌরভিত্তিক বা বৈদ্যুতিক সেচব্যবস্থার দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। দীর্ঘদিন এসব সমাধানের কথা বলা হলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন সিপিডির এই গবেষণা পরিচালক।
জ্বালানি খাতের জন্য জরুরি প্রতিক্রিয়া দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই দল জরুরি ভিত্তিতে সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ করবে। স্বাভাবিক প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় টেন্ডারসহ বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে অনেক সময় লাগে। তাই নিয়ম মেনে কীভাবে এসব প্রক্রিয়ার সময় কমিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংলাপে উপস্থাপিত সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, দেশের তৈরি পোশাক খাতে টেকসই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। গবেষণাটি ৩৫০টি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত হয়।
গবেষণায় আরও বলা হয়, গার্মেন্ট খাতে ১৫ হাজার ২টি যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন জরুরি। এতে ওই টাকা ব্যয় হবে। এর ৫০ শতাংশ আধুনিকায়নে ব্যয় হবে ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের ৭০ দশমিক ৯ শতাংশই প্রযোজ্য হবে বড় কারখানাগুলোর জন্য, যেখানে গড়ে ২ হাজার ১০৫ জনের বেশি কর্মী রয়েছেন। প্রতি কারখানায় গড়ে ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নে খরচ হবে ৭৩ দশমিক ১ কোটি টাকা।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, কাটিং বিভাগে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ মেশিন থাকলেও প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ সাশ্রয় সম্ভব। সেলাই বিভাগে ৮৫ শতাংশ মেশিন থাকলেও প্রযুক্তিগতভাবে অপরিহার্য হওয়ায় সাশ্রয়ের হার ২ দশমিক ৯ শতাংশ। আর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে কারখানার বিদ্যুৎ খরচ ৪ দশমিক ৪ থেকে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমানো সম্ভব।
সিপিডির পক্ষ থেকে ছোট ও মাঝারি কারখানার প্রযুক্তি পরিবর্তনে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ এবং কারখানাগুলোয় কার্যক্ষমতাভিত্তিক এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করার ওপরও তাগিদ দেওয়া হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশের জন্য দায়ী।
বিজিএমইএ-এর সহসভাপতি ব্যারিস্টার বিদিয়া অমৃত খান বলেন, বাংলাদেশ এখনই কার্বন নিঃসরণ কমানোর কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে দেশের পোশাকের চাহিদা কমে যেতে পারে। ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জাম আমদানিতে এখনো উচ্চহারে শুল্ক ও ভ্যাট দিতে হচ্ছে।
বিএসআরইএ-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সরকার বাজেট বক্তৃতায় সৌর প্যানেলের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বললেও বাস্তবে আমদানির সময় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ধরনের কর দিতে হচ্ছে। বর্তমানে শতাধিক সৌর প্যানেলভর্তি কনটেইনার বন্দরে আটকে রয়েছে। এতে উদ্যোক্তাদের বিপুল পরিমাণ জরিমানাও দিতে হচ্ছে।
বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দেশে সবুজ অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকলেও তা পাওয়া অত্যন্ত জটিল। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য বহন করা কঠিন। ফলে উদ্যোক্তারা চাইলেও দ্রুত সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারছেন না।