Image description

এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাশ ও জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়িতে কিছু প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। তবে ঝকঝকে এই ফলাফলের আড়ালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এক অন্ধকার রুপ সামনে এসেছে।  

রাজধানীসহ কয়েকটি নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বা নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। এর মধ্যে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল ও ঢাকার মাইলস্টোন কলেজ অন্যতম। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার জন্য কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ও ফরম পূরণকারী পরীক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। 

ঢাকা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ শিক্ষার্থীর মধ্যে সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। পাশের হার শতভাগ। এছাড়া ২০২৫, ২০২২, ২০১৭ ও ২০১৫ সালেও এই প্রতিষ্ঠানে জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ছিল ১০০ শতাংশ। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে বোর্ড ফলাফলে শীর্ষস্থান দখল করে আসছে। অথচ এর পেছনে রয়েছে নির্মম চিত্র। এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬১৬ জন। এর বিপরীতে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ৩৮২ জন। অর্থাৎ ২৩৪ জন শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। 

 

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের শতভাগ জিপিএ-৫-এর ফলাফল ধরে রাখতেই টেস্ট পরীক্ষাকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

টেস্টে বাদ পড়া শিক্ষার্থীরা নরসিংদীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েছে। নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে এসএসসি দেওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ জনই পেয়েছে জিপিএ-৫। ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়া ৫ জনের মধ্যে ৩ জন এবং নরসিংদী মডেল স্কুলের ৪ জনের মধ্যে ১ জনসহ বেশ কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালো ফলাফল করেছে।

এবার মাইলস্টোন কলেজ থেকে বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সনে মোট ১৪৯৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছে ১৪৮৮ জন। পাশের হার ৯৯.৬৭ শতাংশ। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১৩ জন শিক্ষার্থী। দিয়াবাড়ীতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ছিল ১ হাজার ৯৯১ জন। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে ১ হাজার ৪৪০ জন। ৫৫১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা অংশ নিতে পারেনি। এছাড়া মোহাম্মদপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ছিল ২০৪ জন। পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১৩৪ জন। তার মধ্যে ৭০ জন অংশ নিতে পারেনি।  

 

ভিকারুননিসা নূন স্কুলে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ছিল ২ হাজার ১৩৪ জন। পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ২ হাজার ৭২ জন। এর মধ্যে ৭০ জন পরীক্ষা অংশ নিতে পারেনি। রাজধানীর মনিপুর স্কুলে নিবন্ধিত ছিল ৩ হাজার ৪৯০ জন। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৩ হাজার ৩৫৯ জন। পরীক্ষা দিতে পারেনি ১৩১ জন। মতিঝিল আইডিয়ালে নিবন্ধিত ২ হাজার ৭৭০ জনের বিপরীতে ফরম পূরণ করেছে ২ হাজার ৭২২ জন।

অভিযোগের বিষয়ে কাদের মোল্লা স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, প্রথম দফার টেস্ট পরীক্ষায় তারা এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করেছিল। অভিভাবকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে অনেকেই নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারায় এসএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করতে পারেনি।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল যুগান্তরকে বলেন, নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল কতজন আর পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে কতজন এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা নেই। তবে শতভাগ পাশ দেখানোর জন্য কোনো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে নবম শ্রেণিতে ভর্তি বা নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পাশের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার হার-সব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা উচিত। তাহলে অভিভাবকরা বুঝতে পারবেন, শতভাগ পাশের পেছনে প্রতিষ্ঠানটি কতজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে কাজ করেছে। নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো ফলাফলকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা। ফলাফল ভালো হলে প্রতিষ্ঠানের চাহিদা বাড়ে, ভর্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে কোচিং, বিশেষ ক্লাস, পরিবহণসহ বিভিন্ন সেবার বাজারও সম্প্রসারিত হয়। 

 

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শুধু পাশের হার বা জিপিএ-৫ দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা উচিত নয়। এই প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীর মানসিক চাপও বাড়ছে। ‘ভালো ফল করতেই হবে’, ‘জিপিএ-৫ পেতেই হবে’-এমন প্রত্যাশা অনেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় পড়াশোনার চাপের মধ্যে রাখে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, শতভাগ পাশের হার দেখানোর জন্য কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অতীতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তা সন্তোষজনক না হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বিগত সময়েও যারা এমন অনিয়ম করেছে তাদের বিষয়েও কাজ চলছে।