Image description

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভায় বিনামূল্যে বিতরণের জন্য দেওয়া হয়েছিল চার হাজার ৪০০টি ডাস্টবিন। উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো। কিন্তু ইচ্ছামতো বিতরণ এবং তদারকির অভাবে বর্তমানে ১৬৬৮টি ডাস্টবিনের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

এলজিইডির নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) আওতায় ২০২৪ সালে ২০ লিটারের চার হাজার ছোট ও ১২০ লিটারের ৪০০টি বড় ডাস্টবিন দেওয়া হয়। 
কিন্তু পৌরসভার দেওয়া হিসাবেই বড় ধরনের গরমিল উঠে এসেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৪০০ বড় ডাস্টবিনের মধ্যে ২০৬টি বিতরণ করা হয়েছে। সে হিসাবে অবশিষ্ট থাকার কথা ১৯৪টি। অথচ বর্তমানে পৌরসভায় একটি বড় ডাস্টবিনও নেই। একইভাবে চার হাজার ছোট ডাস্টবিনের মধ্যে ৯৯২টি বিতরণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে ১৫৩৪টি। অর্থাৎ ১৪৭৪টি ছোট ডাস্টবিনের কোনো হিসাব মিলছে না। সব মিলিয়ে ১৬৬৮টি ডাস্টবিনের খোঁজ নেই।

 

২০২৪ সালের শুরুর দিকে আসা এসব ডাস্টবিন সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিমের আমলে দলীয় প্রভাবে বিলিয়ে দেওয়া হয়। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে ও পরে রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে কোনো নথি ছাড়াই ডাস্টবিনগুলো যে যার মতো নিয়ে গেছে। পরে তদন্তের ভয়ে সাবেক ওই কর্মকর্তা নথিপত্র উধাও করে বদলি হন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মজিবর রহমানও দেখভালের ব্যাপারে উদাসীন।

চারঘাট পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মজিবর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প থেকে পৌরসভায় কতটি ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছিল, সেটি আমার জানা নেই। ডাস্টবিন-সংক্রান্ত ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো পৌরসভা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ফাইল পাওয়া যায়নি।’ ফাইল নষ্ট করার কথা অস্বীকার করে সাবেক প্রকৌশলী রেজাউল করিমের দাবি, রাজনৈতিক সুপারিশে সামান্য কিছু বিতরণ হলেও সব হিসাব খাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ছোট ডাস্টবিনের জন্য ১০০ টাকা এবং বড় ডাস্টবিনের জন্য ৩০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, ‘ডাস্টবিনগুলো বিনামূল্যে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৈধভাবে নিতে গেলে টাকা দিতে হয়েছে। অথচ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি টাকা ছাড়াই ডাস্টবিন নিয়ে গেছেন।’ টাকা কেন দিলেন এ প্রশ্নের জবাবে সেলিম রেজা বলেন, ‘পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের জন্য টাকা দিতে বলা হয়েছিল, তাই বাধ্য হয়ে দিয়েছি।’
এদিকে পৌরসভার বাইরে বিতরণের নিয়ম না থাকলেও নিমপাড়া ও ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন দোকান এবং সদরের তালবাড়িয়া এলাকার বসতবাড়িতে ডাস্টবিন ব্যবহার করতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা জানান, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মহিদুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগ নেতা নূরে আলমের সুপারিশে তারা এগুলো পেয়েছেন। অন্যদিকে ৫ আগস্টের পর একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন স্থানে এসব ডাস্টবিন সরবরাহ করেছে, যেখানে এক ছাত্রদল কর্মীর নাম উঠে এসেছে। 

পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে,  অনেক ডাস্টবিন ময়লার ভাগাড়ে পড়ে আছে। কোথাও ডাস্টবিন ব্যবহৃত হচ্ছে না, আবার কোথাও ডাস্টবিনের চারপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আবর্জনা। নিয়ম অনুযায়ী এসব ডাস্টবিন থেকে পৌরসভার গাড়িতে করে বর্জ্য সংগ্রহ করে ভাগাড় বা স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা চোখে পড়েনি।
পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডাস্টবিন বিতরণে নির্দিষ্ট তদারকি ব্যবস্থা ছিল না। পৌরসভার একটি প্রভাবশালী চক্র পছন্দমতো বিভিন্ন ব্যক্তিকে ডাস্টবিন দিয়েছেন। এর মধ্যে ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন ডাকরা বাজারে এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও ডাস্টবিন নিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। 
৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম রায়হান বলেন, ‘বিভিন্ন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ডাস্টবিন এনে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করছে। কিন্তু তাদের থামানোর মতো কেউ নেই।’
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বিতরণ করা ডাস্টবিন থেকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চারঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘পৌর কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় পুরো উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।’
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’