Image description

নিয়োগবিধি চূড়ান্ত না করেই বাংলাদেশ রেলওয়ের ৮৫ কর্মকর্তাকে নবম গ্রেড থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। আজ রোববার বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উঠতে যাচ্ছে। প্রশাসনিক বিধি-বিধান ও সুশাসন উপেক্ষা করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কমিটির সদস্যরাও। পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পদোন্নতি সুপারিশকারী কর্মকর্তারা পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। রেলওয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, রোববার বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় বিসিএস (রেলওয়ে) ক্যাডারের ৬ষ্ঠ গ্রেডের একাধিক শূন্য পদের বিপরীতে কর্মকর্তা পদোন্নতির প্রস্তাব তোলা হচ্ছে।

 

এর মধ্যে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৫টি পদের বিপরীতে ৮ জন, পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের ২৭টির বিপরীতে ৭, বৈদ্যুতিক বিভাগের ৯টির বিপরীতে ৩, যান্ত্রিক বিভাগের ১৯টির বিপরীতে ১, সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ১০টির বিপরীতে ২ এবং সরঞ্জাম বিভাগের ৫টি শূন্য পদের বিপরীতে ১ জনসহ মোট ৮৫টি পদে পদোন্নতির প্রস্তাব সভার আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।

 

রেলওয়ে সচিবের সভাপতিত্বে পদোন্নতি কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্তি সচিব, রেলওয়ের মহাপরিচালক, অর্থমন্ত্রণালয় ও জন-প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন করে যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। তাদের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হবে।

 

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২১ সালের বিতর্কিত নিয়োগবিধি বাতিল হওয়ার পর নতুন বিধিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নতুন বিধিমালার প্রস্তাব পর্যালোচনাধীন থাকলেও তা চূড়ান্ত অনুমোদিত হয়নি। অথচ বিধিমালা ছাড়াই পদোন্নতি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ নিয়ে বিভাগীয় কমিটির সদস্যরা চাপে রয়েছেন।

 

নবম থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে উন্নীতের প্রস্তাব ডিপিসির সভায় উঠছে আজ

 

 

বিধি চূড়ান্ত না হওয়ায় বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, দ্বিধান্বিত কমিটির সদস্যরা

 

 

পরবর্তীতে প্রশ্নবিদ্ধ বা বাতিল হতে পারে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া

 

 

বিভাগীয় মামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন সুপারিশকারী কর্মকর্তারা

 

 

সুশাসনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেছেন সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা

 

 

এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন আমার দেশকে বলেন, প্রায় ৪৭ হাজার জনবলের খসড়া নিয়োগ বিধিমালার আলোকে রেলে কিছু নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্তমানে ওই খসড়া নিয়োগ বিধিমালার আলোকেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পদোন্নতি সংক্রান্ত ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশন কমিটির সব কার্যক্রম রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন। এর সবকিছু মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করবে। তাই এ সংক্রান্ত সব প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দিতে পারবে বলে জানান রেলওয়ের ডিজি।

 

আজ রোববার রেলওয়ে বিভাগে কর্মরত অফিসারদের পদোন্নতির সভা অনুষ্ঠানের বিষয়টি স্বীকার করেন রেলওয়ের অতিরিক্ত সচিব ও কমিটির সদস্য রুপম আনোয়ার। তিনি আমার দেশকে বলেন, এ সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু জানার দরকার হলে তথ্য অধিকারের বিধান অনুযায়ী আবেদন করার জন্য এ প্রতিবেদককে পরামর্শ দেন।

 

তবে, অর্থমন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য মোস্তাক আহমেদ এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, নিয়োগবিধি আছে কি নেই, এখনও আমি জানি না। যদি না থাকে তাহলে অতীতের রেফারেন্স অনুসরণ করা হবে। কারণ পদোন্নতি একজন চাকরিজীবীর নৈতিক অধিকার। তারপরও বলব আমি একজন চাকরিজীবী এবং আমাকে নৈতিক জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সব কিছু পর্যালোচনার পর যদি মনে হয়, পদোন্নতির সুপারিশ করার সুযোগ রয়েছে তাহলে একরকম। আর যদি না থাকে তাহলে ভিন্নতা।

এর পরও আমাকে যদি নৈতিক সমর্থন পেতে ওপর থেকে কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে নিজের আত্মরক্ষার্থে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিব। বিধি ও রুলস অব প্রসিডিউর-এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

 

কমিটির অপর সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি যুগ্মসচিব রায়হান আখতার এ প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। পদোন্নতির সুপারিশ করার ক্ষেত্রে নিয়োগবিধি থাকা জরুরি কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা না থাকলে তো বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি গঠন ও সভা আহ্বান করার কথা না। কমিটির সভায় আলোচনার পর বিষয়টি তার কাছে আরো স্পষ্ট হবে বলে জানান তিনি।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিধিবহির্ভূত বা অনুশাসনের ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতি দেওয়া হলে পদোন্নতি কমিটির সদস্যদের ওপর আইনি দায়ভার এসে বর্তাবে। জনপ্রশাসন ও সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, বৈধ পদোন্নতি বিধি ব্যতিরেকে পদোন্নতির অনুমোদন দেওয়া ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ এবং সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।

সূত্রটি আরো জানায়, পদোন্নতি কমিটির কোনো সদস্য যদি নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতির নথিতে স্বাক্ষর করেন, তবে পরবর্তীতে অডিট কিংবা আদালত থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে তা সরাসরি ‘অসদাচরণ’ ও ‘দায়িত্বে অবহেলা’ হিসেবে গণ্য হবে। এমনকি আইনগত বৈধতা না থাকায় উক্ত পদোন্নতি বাতিল হলে পদোন্নতি কমিটির সদস্যরা প্রশাসনিক তদন্ত, বিভাগীয় মামলা কিংবা পদোন্নতি সংক্রান্ত সুবিধা আটকে যাওয়ার মতো গুরুতর পেশাগত ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

 

এদিকে, নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি দেওয়ার এই তোড়জোড়কে সুশাসনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সাবেক আমলারা। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার আমার দেশকে বলেন, নিয়োগবিধি হচ্ছে যেকোনো পদোন্নতির মূল আইনগত ভিত্তি। বিধিমালা চূড়ান্ত না করে কিংবা বাতিল হওয়া বিধির ওপর নির্ভর করে পদোন্নতি দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এটি সরকারি চাকরি বিধিমালা ও প্রশাসনিক নীতিশাস্ত্রের পরিপন্থী।

 

তিনি বলেন, পদোন্নতি না হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, তবে এর সমাধান তড়িঘড়ি কোনো বেআইনি পদক্ষেপে হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর উচিত দ্রুত নতুন বিধিমালা জারি করে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পদোন্নতি সম্পন্ন করা। অন্যথায় পরবর্তীতে পুরো পদোন্নতি প্রক্রিয়া আইনিভাবে বাতিল হতে পারে এবং কমিটির সদস্যরাও বিপদে পড়তে পারেন।

 

ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি বলেও সাবেক আমলারা মত দিয়েছেন। তাদের মতে, ১৯৮০ সালের পুরোনো বিধিমালা পর্যালোচনা কিংবা চলমান প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালার দ্রুত গেজেট প্রকাশ না করে পদোন্নতি ত্বরান্বিত করা হলে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বিধিমালা চূড়ান্ত করে তবেই পদোন্নতি কমিটি গঠন ও সুপারিশ করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।