Image description
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারাগারের কিছু সেবায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বদলায়নি পুরোনো অনিয়ম। কারাগারে কোনো বন্দি প্রবেশের পরই শুরু হয় অনৈতিক উপায়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। উন্নত খাবার সরবরাহ, অসুস্থ না হয়েও হাসপাতালে চিকিৎসার নামে আয়েশে থাকা, কারাগারে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ থেকে শুরু করে পছন্দমতো সেলে থাকাসহ পদে পদে দুর্নীতি হচ্ছে। এমনকি বন্দিদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কম্বল, ব্রাশ, পেস্ট, জুতা ও তোয়ালে ঘিরেও চলছে অঘোষিত বাণিজ্য। টাকা দিলে মিলছে সব বাড়তি সুবিধা আর টাকা না থাকলে নিয়মের বেড়াজালে আটকে যেতে হচ্ছে সাধারণ বন্দিদের। বন্দির স্বজনদের ফাঁদে ফেলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা। তথ্যকেন্দ্রগুলোয় টাকা ছাড়া মিলছে না বন্দিদের তথ্য। কারাগারের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে চলছে এ উৎকোচ বাণিজ্য।

গত মঙ্গল ও বুধবার কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে গিয়ে বন্দির স্বজন ও কারামুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এবং অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিতর ও বাইরের নানান অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার তথ্য। কারা কর্তৃপক্ষ অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করে জানিয়েছে, অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টাকায় মেলে আরাম-আয়েশ : ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানান, ক্যান্টিনের খাবার চড়া মূল্যে কিনতে বাধ্য করতে সরকারি খাবারের মান খারাপ করা হয়। প্রতিটি ভবনেই রয়েছে ক্যান্টিন। এসব ক্যান্টিন থেকে ডিমের তরকারি ৫০, এক পিস মুরগি ৮০ ও ছোট তিন পিস গরুর মাংস ১২০ টাকা দামে বিক্রি করা হয়। করতোয়া ভবনের নিচের ক্যান্টিনকে মূল ক্যান্টিন মনে করা হয়। এ ক্যান্টিনে সবচেয়ে উন্নত খাবার পাওয়া যায়। এসব ক্যান্টিন ঘিরেও মাসিক ভিত্তিতে বড় উৎকোচ ওঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানান, সোনা পাচার মামলায় যারা কারাগারে যান, তাদের সবচেয়ে মূল্যবান বন্দি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ কর্মকর্তারা মনে করেন তারা বিত্তশালী হবেন। তাদের ভালো রাখার ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন প্রস্তাব পাঠানো হয়। যারা প্রস্তাবে রাজি হন, তাদের জন্য বিভিন্ন সুব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে মধুমতী ভবনের ছয় তলায় ৬/১ নম্বর সেলে ১৫ জন বন্দির সবাই সোনা পাচারসংশ্লিষ্ট (কারারক্ষীদের ভাষায় গোল্ডেন) বলে জানা গেছে।

সূর্যমুখী, শাপলা ও বনফুলের বিভিন্ন সেলে হেভিওয়েট রাজনৈতিক বন্দিদের রাখা হয়েছে। সেখানেও চাহিদা অনুযায়ী উৎকোচ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কারাগারের সামনে কথা হয় এক রাজনৈতিক বন্দির ভাগনের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, কারাগারে আসার পর ২০ হাজার টাকা দিয়ে তাঁর মামাকে একটি ভালো সেলে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আমলের এক কাউন্সিলর এবং একই দলের অন্য এক নেতা রয়েছেন। শুরুতে কষ্ট হলেও এখন আর অসুবিধা নেই। এদিকে কম্বল দখলে রাখতেও উৎকোচ দিতে হয় বন্দিদের। কোনো কোনো বন্দি পাঁচ থেকে আটটি কম্বলও নিজের দখলে রেখে আরামদায়ক বিছানা বানিয়ে ঘুমান। এ ক্ষেত্রে তল্লাশির সময় সুবিধাভোগী কারারক্ষীরা সেটি দেখেও দেখেন না। অথচ প্রতি বন্দির জন্য বরাদ্দ থাকে দুটি কম্বল। একটি বিছানো, আরেকটি গায়ে দেওয়ার। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন। মাঝেমধ্যে কেউ ধরা পড়লে তাকে শাস্তি হিসেবে অন্য কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

ঘুষ না দিলে মেলে না বন্দির তথ্য : মূল কারাফটকে সাক্ষাতের স্লিপ দেওয়া কাউন্টারের পাশে ও ফটকের ভিতরে ‘প্রিয়জন’ ক্যান্টিনের পাশে দুটি তথ্যসহায়তা কেন্দ্র। ক্যান্টিনের পাশের তথ্যসহায়তা কেন্দ্রটি থেকে জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের তথ্য সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ঘুষ না দিলে কারামুক্তির অপেক্ষায় থাকা বন্দিদের তথ্য স্বজনদের দিতে চান না দায়িত্বরতরা। ১০০ থেকে ৫০০ যার কাছ থেকে যেভাবে সম্ভব টাকা নেয় তথ্যসহায়তা কেন্দ্র। যারা টাকা দেন তাদের বন্দিদের নাম, বাবার নাম ও স্ত্রীর নাম লিখে নেওয়া হয়। এরপর একজন কারারক্ষী কারাগারের ফটক ঘুরে এসে এক একজনের তথ্য দিতে থাকেন।

যারা টাকা দেন না, তাদের বন্দিদের নাম ঠিক রেখে অন্য তথ্য উল্টোপাল্টা বলা হয়। মতিঝিল থানার সাইবার সিকিউরিটি আইনের একটি মামলায় সাজাভোগ শেষে মঙ্গলবার রাতে কারামুক্ত হন আল আমিন নামে এক ব্যক্তি। তাকে নিতে কারাফটকে আসেন তার মামা মোবারক। আল আমিনের তথ্য পেতে ২০০ টাকা দিতে হয়েছে তার। মোবারক বলেন, ‘এবার তো কমই দিলাম। বছরখানেক আগে ৫০০ টাকা দিতে হয়েছিল।’ চাওয়ার সময় ভালো পোশাক দেখলে ২-৩ হাজার টাকাও চেয়ে বসেন কারারক্ষীরা। বন্দির স্বজন সেজে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তথ্যকেন্দ্রের পাশে দাঁড়িয়ে দেখা গেছে, যারা তথ্য নিতে আসছেন তাদের থেকে ‘খুশিমনে যা দেবেন দেন’ বলে টাকা নিচ্ছেন দায়িত্বরত কারারক্ষী সুমন। যারা টাকা দিচ্ছেন না, তারা কোনো তথ্য না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্দির মুক্তির অপেক্ষা করছেন।

পণ্য না কিনলে জমা নেওয়া হয় না কাপড় : সাধারণত কোনো আসামিকে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলে স্বজনরা প্রথম সাক্ষাতে কাপড় নিয়ে হাজির হন। লুঙ্গি, গামছা, স্যান্ডেল, পেস্ট, ব্রাশ, গেঞ্জির মতো জরুরি কিছু জিনিসপত্র পাঠানোর চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রেও বাণিজ্যের পসরা সাজানো হয়েছে। শুধু একটি লুঙ্গি ও একটি গেঞ্জি ছাড়া আর কিছু গ্রহণ করা হয় না। অন্য সবকিছুর জন্য নগদ টাকা গ্রহণ করা হয়। তোয়ালে ১৫০, পেস্ট ১২০ ও ব্রাশের জন্য ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা আছে। কী মানের পণ্য দেওয়া হচ্ছে, তা-ও দেখার সুযোগ পান না স্বজনরা। ইব্রাহিম (ছদ্মনাম) নামে এক ব্যক্তি জানান, তাঁর শ্যালক মালিবাগ থেকে গাঁজাসহ ধরা পড়ায় ২০ দিনের জেল হয়েছে। শ্যালককে দেখতে স্ত্রী, শিশু সন্তানসহ এসেছেন। কিন্তু একটি লুঙ্গি ও গেঞ্জি ছাড়া আর কিছু নেওয়া হয়নি। অন্য সবকিছুর জন্য নির্দিষ্ট রেট অনুযায়ী নগদ টাকা জমা দিতে হয়েছে।

টাকা না দিলে কষ্টের কাজ পান বন্দিরা : প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাভোগ করেছেন মীজান নামে এক ব্যক্তি। তিনি কামরাঙ্গীরচর থানার অস্ত্র আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কারাফটকের সামনে কথা হয় মীজানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যারা চাহিদামতো টাকা দেন শুধু তারাই ভালো সুযোগসুবিধা পান। অন্যদের ৭০-৮০ জনের সঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়। কাজ হিসেবে বালতি ভরে খাবার আনা, বণ্টন, টয়লেট পরিষ্কারের মতো কাজ দেওয়া হয়। কারাবন্দিদের জন্য ভিতরে কাজ করে আয়েরও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সিস্টেমে না গেলে কাজ করার সুযোগও মেলে না। আর নতুন যে বন্দিরা ভিতরে যান, তাদের দিয়ে পুরোনো বন্দিরা নিজেদের কাপড় ধোয়ানো থেকে শুরু করে সব কাজ করাতে থাকেন। তখন টাকা দিয়ে একটু ভালো পরিবেশে যেতে বাধ্য হন বন্দিরা।’

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা নিচ্ছেন কারারক্ষীরা : বন্দিদের বিভিন্ন সুযোগসুবিধা দেওয়ার আশ্বাস এবং অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কথা বলে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ সহজ করা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়া, হাসপাতালে পাঠানো কিংবা কারাগারের ভিতরে ভালো খাবার খাওয়ানোর আশ্বাস দিয়ে ৫-২০ হাজার টাকাও নেওয়া হচ্ছে। টাকা পাঠানোর পরও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। কারাগার সূত্রের দাবি, কিছু কারারক্ষীর স্বজনদের মোবাইলে ঢুকছে এসব টাকা।

নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা কোহিনূর বেগম বলেন, তাঁর ছেলে শাহজামান কারাগারে অসুস্থ জানিয়ে সালমান নামে এক কারারক্ষী ৫ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে বলেন। তিনি টাকা না পাঠিয়ে কারাগারে এসে ওই কারারক্ষীকে কল দিলে ক্যাশ টাকা হাতে দিতে বলা হয়। টাঙ্গাইল থেকে আসা সাদাত নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার ভাই সফিকুল ইসলামকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে বলে কারাগার থেকে মোবাইলে টাকা পাঠাতে বলা হয়। সামাদ নাকি পদ্মার ২/৮ নম্বর রুমে আছে।’ তবে পরে কারাগার ও হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও ভাইয়ের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্বজন বলেন, ‘দুই দফা টাকা পাঠিয়েও এক কারারক্ষী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি কথা রাখেননি। অথচ কারাগারে থাকা ভাইয়ের ভালোর জন্য আমরা সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠিয়ে দিই।’ কারা সূত্র জানিয়েছেন, কারারক্ষী ছাড়াও প্রতারক চক্র বন্দির স্বজনদের ফাঁদে ফেলে টাকা নিচ্ছে।

জামিন করানো সিন্ডিকেটের তৎপরতা : হাতে দামি মোবাইল ফোন ও মার্জিত পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি কারাগারের বাইরের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সেখানে বিভিন্ন জায়গায় বসে থাকা বন্দিদের স্বজনদের কাছে যাচ্ছেন। নিজেকে রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে থাকা এক ব্যক্তির জামাই পরিচয় দিয়ে ভাব জমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে নিজেকে জামিন করানোর এক্সপার্ট হিসেবে উপস্থাপন করে হাই কোর্টের মাধ্যমে যেকোনো বন্দির জামিন করিয়ে দেবেন প্রলোভন দেখাচ্ছেন। বন্দির স্বজন পরিচয়ে কথা বললে ওই ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে জানান, তাঁর নাম মীজান। বাসা রাজধানীর দক্ষিণখানে। শ্বশুরের জামিনের জন্য আদালতে দৌড়াতে দৌড়াতে এ বিষয়ে সব লাইনঘাট বুঝে গেছেন। মামলা বুঝে চুক্তি করলে দ্রুতই জামিন করিয়ে দিতে পারবেন। কারামুক্তির আগে কোনো টাকাই দিতে হবে না। পরে যোগাযোগ করব জানিয়ে ফোন নম্বর রাখা হয়। পরে কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

অব্যবস্থাপনা আছে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে : অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কিছু অব্যবস্থাপনা আছে, তবে আমাদের নজরে আসা মাত্রই সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে গত পাঁচ মাসে ৯টি বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। বরখাস্ত হয়েছেন চারজন। সময়ের সঙ্গে কারাসেবা দিনদিন উন্নত হচ্ছে। আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে কেউ কোনো বন্দিকে বাড়তি সুবিধা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পণ্য না কিনলে কাপড় না দেওয়ার সিস্টেম বন্ধ করা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘তথ্যকেন্দ্রগুলোয় কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। সেখানে বহিরাগত একটি গ্রুপ সক্রিয়। এর পরও আমি বলে দিচ্ছি যাতে সেখানে বন্দির স্বজনরা কাক্সিক্ষত সেবা পান। এ ছাড়া সোনা পাচার মামলার আসামিরা যদি এক জায়গায় থেকে থাকেন বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খাবারের মান আগের তুলনায় অনেক ভালো। টাকার বিনিময়ে অন্য যেসব অভিযোগ উঠছে সেসব ঠিক নয়। যারা অভিযোগ করছেন, তারা আমাদের কাছে আসুক। আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’