এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও ফাঁকা থাকবে ২০ লাখের বেশি আসন, যা মোট আসনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা বোর্ডে প্রায় ১৪ লাখ ৫১ হাজার এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে (ডিপ্লোমাসহ) ফাঁকা থাকবে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ আসন। সেই সঙ্গে এসএসসির পর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা যুক্ত হলে ফাঁকা আসনের সংখ্যা আরও বাড়বে। বর্তমানে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের উচ্চমাধ্যমিক ও চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা নিয়ে মোট আসন সংখ্যা ৩১ লাখ ৫১ হাজারের বেশি। শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা এ পরিস্থিতির জন্য শিক্ষার মানের অবনতি, আয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যাঙের ছাতার মতো মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য, শিক্ষিত মানুষের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ঝরে পড়াকে দায়ী করছেন।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি ছাড়া ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার প্রথম বর্ষে আসন সংখ্যা ২৫,৯০,৩৮৭টি। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন, এইচএসসি ভোকেশনাল, এইচএসসি বিএমটি ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আসন আছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ১০০টি। বোর্ডটির অধীনে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পর্যায়ে আসন আছে আরও ২ লাখ ৪১ হাজার ৭০০টি। সব মিলে এসএসসি পাসের পর ভর্তির জন্য দেশের কলেজ-মাদ্রাসাগুলোয় আসন আছে ৩১ লাখ ৫১ হাজার ১৮৭টি। আর গত সোমবার প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। সবাই ভর্তি হলেও ফাঁকা থাকবে ২০ লাখ ১২ হাজার ৩১০টি আসন।
এদিকে ২০২৪ সালে যারা এসএসসি পাস করেছে, তারা ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করে ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন। চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। অর্থাৎ, ঝরে গেছে ৪ লাখ ১ হাজার ৫৭০ জন। কেউ টেস্ট পরীক্ষায় খারাপ করায় চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। আরেকটা অংশ এসএসসি পাসের পর লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। ঝরে পড়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে উচ্চ মাধ্যমিকে ফাঁকা আসন আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে বড় সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে।
বন্ধ হতে পারে অনেক প্রতিষ্ঠান : চলতি বছর এসএসসির ফলাফলে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কেউ পাস করেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এদিকে শিক্ষায় সন্তোষজনক মান ধরে রাখতে না পারায় অনেক কারিগরি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বোর্ড। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কারিগরিতে একাদশ ও সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিকে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে পাঁচ লাখের মতো। এর মধ্যে প্রায় ২৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করা হবে এবার। সেক্ষেত্রে কারিগরিতে ভর্তিযোগ্য আসন কমে আসবে।
শিক্ষাবিদরা বলেছেন, বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধার কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্রছাত্রী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। তারা ভর্তি না হলে আসন আরও ফাঁকা থাকবে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়তো শিক্ষার্থীই পাবে না। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় পাস করা শিক্ষার্থী অনেক কম। তার ওপরে হাতেগোনা কিছু নামকরা কলেজে ভর্তি হতে সবাই দৌড়ঝাঁপ করবে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকবে।
ঢাকার সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেন, পাসের হার বাড়াতে শিক্ষার্থীদের অনলাইন আসক্তি থেকে বের করে ক্লাসে মনোযোগী করতে হবে। এজন্য অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকেও নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। স্কুল ও কলেজের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মান বাড়ানো জরুরি। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। ঝরে পড়া দূর করতে শিক্ষিতদের সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খারাপ করছে, কেন করছে তা খুঁজে বের করতে হবে।
প্রকৃত মূল্যায়নেই কমেছে পাসের হার : শিক্ষামন্ত্রী
প্রকৃত মূল্যায়নের কারণে এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, জোর করে কাউকে ফেল বা পাস করানো যায় না। শিক্ষার্থীদের অনেকে ভালো করতে পারেনি। এর দায় শুধু তাদের নয়, শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিজেরও দায় রয়েছে।
গতকাল ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে ‘মজবুত অর্থনীতির জন্য শিক্ষা : দক্ষতা, ভাষা ও বৈশ্বিক গতিশীলতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ (ইআরআই) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মান জানতে বাস্তব তথ্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পাসের হার বাড়ানোর জন্য বোর্ডকে প্রভাবিত করলে প্রকৃত চিত্র জানা যাবে না। ইংরেজি বা গণিতে কয়েক নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে কাউকে পাস করানো সম্ভব, কিন্তু তাতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দুর্বলতা জানা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মান, দুর্বলতা এবং কোথায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এসব জানতে বাস্তব তথ্য দরকার।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বলেন, দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার সম্প্রসারণের সঙ্গে দক্ষতা ও কর্মসংস্থান একই হারে বাড়েনি। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে। অনেক তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আগামী বছর প্রথম থেকে দশম শ্রেণির কারিকুলামে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। জানুয়ারি থেকে এসব পরিবর্তন পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে। নভেম্বরে পরীক্ষা শেষে প্রতিটি স্কুলে একাডেমিক, কালচারাল ও সাংস্কৃতিক তিন ধরনের ক্যালেন্ডার দেওয়া হবে। সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, ইউনেস্কোর প্রতিনিধি সুশান ভাইজ, বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুরসহ অনেকে।