সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গত এক দশকে আইন, বিধিমালা, নানামুখী কার্যক্রম মিলিয়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কিন্তু সব উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ। মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তিন চাকার অবৈধ যানবাহন। উদ্যোগের অভাব নয়; বরং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান, সমন্বয়, নজরদারি ও জবাবদিহির ঘাটতিকেই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনার তদারকি- সব ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা। সংজ্ঞা অনুযায়ী মহাসড়কে লোকাল গাড়ি ও পথচারী আসার কথা নয়। শ্রেণিবিন্যাসের দিক থেকে স্থানীয় রাস্তা, মধ্যম পর্যায়ের রাস্তা, প্রধান সড়ক; তার পরে মহাসড়ক। সংজ্ঞা অনুসারে মহাসড়ক কোনো এলাকাকে রাজধানীর সঙ্গে অথবা বন্দরনগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং এর মান হবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের। এই মান আসে ব্যবহারকারীদের মধ্যে শৃঙ্খলা দিয়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সব ব্যবহারকারী সমগতির হলে সড়কের ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে যত্রতত্র মহাসড়কে যে কেউ ঢুকে পড়তে পারে। এটা পরিকল্পনার বিশৃঙ্খলার প্রমাণ।’
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা, চালক ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর চিকিৎসাসেবায় বড় ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন খাতে গত দেড় দশকে অন্তত ১০টি আইন, নীতি ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অগ্রাধিকারের পরিবর্তন ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক উদ্যোগ কার্যকর হয়নি।
সড়ক নিরাপত্তা বিভাগ ও সচেতনতা কার্যক্রম : সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে সচেতনতা ও প্রচার জোরদারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অধীনে ২০১৬ সালে সড়ক নিরাপত্তা বিভাগ গঠন করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে ট্রাফিক সপ্তাহ, সড়ক নিরাপত্তা সপ্তাহ, প্রচারাভিযান, চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। কিন্তু এসব প্রচারের বড় অংশই ছিল স্বল্পমেয়াদি। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় অর্থবছরে বিআরটিএর সড়ক নিরাপত্তা বিভাগ সচেতনতামূলক প্রচারে ১৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। অথচ এ সময়েও সড়ক দুর্ঘটনার পরিস্থিতিতে কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর বড় আইন : ২০১৮ সালের জুলাই-আগস্টে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে সরকার সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। আন্দোলনের অন্যতম বড় ফল ছিল নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে পাস হয় সড়ক পরিবহন আইন। ১৯৮৩ সালের পুরোনো মোটরযান অধ্যাদেশের পরিবর্তে এ আইন আনা হয়। নতুন আইনে বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত গাড়ি চালনা, লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেসসহ বিভিন্ন বিষয়ে শাস্তির বিধান রাখা হয়। বিশ্বব্যাংকও আইনটিকে বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু আইন পাস হওয়ার পরও এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপ, আইন প্রয়োগে শিথিলতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কঠোর বিধান কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
২০২০-২২ : জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশল ও নতুন বিধিমালা : সরকার জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ করে দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য অর্জন না হওয়ায় পরবর্তী পর্যায়ে সময়সীমা ২০৩০ পর্যন্ত নেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক নথিতে বলা হয়েছে, বাস্তবায়নের বড় ঘাটতির কারণে ৫০ শতাংশ মৃত্যু কমানোর লক্ষ্য ২০২০ থেকে ২০৩০ সালে সরানো হয়েছে। এরপর সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের জন্য সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২ প্রণয়ন করা হয়। এতে ১২টি অধ্যায়, ১৬৭টি বিধান, ৯টি তফসিল ও ৪৪টি ফরম রয়েছে। চালকের লাইসেন্স, কন্ডাক্টর ও সুপারভাইজারের লাইসেন্সসহ বিভিন্ন বিষয় এতে বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়।
মহাসড়কে প্রকৌশলগত নিরাপত্তাব্যবস্থা : ২০২৩ সালে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে শুরু হয় বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট। প্রকল্পটির আওতায় উচ্চ ঝুঁকির মহাসড়ক, শহর ও জেলা সড়কে প্রকৌশলগত নিরাপত্তাব্যবস্থা, গতি নিয়ন্ত্রণ, পথচারী সুবিধা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রভাব : সড়ক পরিবহন খাতে শক্তিশালী মালিক ও শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। কঠোর আইন প্রয়োগ বা পুরোনো গাড়ি সরানো, চালকের যোগ্যতা যাচাই কিংবা রুট ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে গেলে প্রায়ই সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর চাপ তৈরি হয়। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে থমকে যায়। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ চালকের বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, ক্লান্তি ও দক্ষতার ঘাটতি। অথচ চালকের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থাকে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য করা যায়নি। পুরোনো, ত্রুটিপূর্ণ ও অনিরাপদ যানবাহন সড়কে চলাচল বন্ধ করার জন্য ফিটনেস ব্যবস্থা থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
মহাসড়কে চলে তিন চাকার ধীরগতির যানবাহন : দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অবাধে চলছে তিন চাকার ধীরগতির যানবাহন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় এসব যানবাহন চললেও নেওয়া হয় না কোনো ব্যবস্থা। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন ও ভটভটিসহ বিভিন্ন ধরনের যান দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে একই সড়কে চলাচল করায় তৈরি হচ্ছে সংঘর্ষের ঝুঁকি। বিশেষ করে মহাসড়কে এসব যান হঠাৎ থেমে যাওয়া, ইউটার্ন নেওয়া কিংবা পাশ কাটানোর সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
সমন্বয়ের ঘাটতি : সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে, বিআরটিএ চালক ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে, পুলিশ আইন প্রয়োগ করে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা দেয়। আবার নগর এলাকায় সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সংস্থারও ভূমিকা রয়েছে। এই বহু সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বছরের বিভিন্ন সময়ে ট্রাফিক সপ্তাহ, নিরাপদ সড়ক দিবস, প্রচারাভিযান ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হয়েছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম অনেকটাই অনুষ্ঠাননির্ভর। গত বছরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তার উন্নতিতে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, সমন্বিত উদ্যোগ ও বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন এবং গতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। গত এক দশকের ব্যর্থতার মূল কারণ নতুন উদ্যোগের অভাব নয়। সমস্যা হলো, আইন ও নীতির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের দূরত্ব।