সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সত্যিই বাংলাদেশে ফিরে আসতে চান বলে মনে করেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান। তার মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও জটিলতা তৈরি করতে পারেন এবং বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণকে আওয়ামী লীগের অনুকূলে পরিবর্তনের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
আল জাজিরাকে দেওয়া মন্তব্যে ডেভিড বার্গম্যান বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছা বাস্তব। তবে তার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তার মতে, আওয়ামী লীগ এখনো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জনমতের গতিপ্রকৃতি সঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। দলটি নিজেদের বর্তমান রাজনৈতিক পতনের দায় স্বীকার না করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নতুন কোনো রাজনৈতিক ভূমিকা তৈরি করা আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন হবে।
বার্গম্যানের মতে, আওয়ামী লীগকে প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে তাদের বর্তমান অবস্থার পেছনে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের দায় রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে তারা যেভাবে একটি ‘ডিস্টোপিয়ান’ বা ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরছে, সেই অবস্থান থেকেও সরে আসতে হবে। তা না হলে দলটি কীভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে জায়গা করে নেবে, সেটি স্পষ্ট নয়।
শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর তার এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনা গত বুধবার নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়ার পর এটিই ছিল কোনো অনুষ্ঠানে সরাসরি যুক্ত হয়ে তার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য।
শেখ হাসিনা বলেন, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। তার এ ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশে তার দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। শেখ হাসিনা অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার ৬ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সম্ভাব্য কারণ ও এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতামত তুলে ধরা হয়।
কুগেলম্যান শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পেছনে তিনটি সম্ভাব্য কারণ দেখেছেন। তার মতে, প্রথমত, শেখ হাসিনা হয়তো মনে করছেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ তার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বেশি অনুকূল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমও এগিয়ে যায়। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে তিনি নিজের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক মনে করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন। তাই দেশে ফিরে আদালতে নিজের অবস্থান তুলে ধরে নিজের নাম কলঙ্কমুক্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। অর্থাৎ তার দেশে ফেরার ঘোষণার পেছনে আইনি ও রাজনৈতিকভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষাও থাকতে পারে।
তৃতীয় কারণটি ব্যক্তিগত। কুগেলম্যানের মতে, শেখ হাসিনা হয়তো রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে বাংলাদেশে ফিরে অবসর জীবন কাটাতে এবং নিজের দেশেই মৃত্যুবরণ করতে চান। তবে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার জন্য পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন কুগেলম্যান।
তার মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার করা হবে। তার প্রত্যাবর্তন আওয়ামী লীগের সমর্থক ও বিরোধী—দুই পক্ষকেই সক্রিয় করে তুলতে পারে। এতে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তার বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়েও সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। কুগেলম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শুধু দেশে ফিরে আসাটাই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিক্কেই এশিয়াকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে চান। তার মতে, দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আনুগত্যের প্রতিদান দেওয়ার একটি উপায়ও হতে পারে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ সরকার এর আগে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে একাধিকবার অনুরোধ করেছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে বিএনপির নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ভারত তাকে আমন্ত্রণও জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনের আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছিলেন, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অনুষ্ঠানে প্রকাশিত কোনো মতামতকেও ভারত সরকার সমর্থন করে না বলেও তিনি জানান।
এর আগে ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারতের সহযোগিতা চেয়েছিলেন, যাতে শেখ হাসিনাসহ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন। এমন কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ভারতের প্রতি কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। সেখানে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ভারতকে আগেই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল। এরপরও ভারতের মাটিতে এমন আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে। জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময়কে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই আন্দোলনে নিহতদের প্রতি গুরুতর অপমান বলেও উল্লেখ করা হয়।
শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে কুগেলম্যান মনে করেন, নয়াদিল্লি মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে বাংলাদেশের কাছে এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হবে না। তার মতে, ভারত চাইলে সংবাদ সম্মেলনটি ঠেকাতে পারত। ফলে ঢাকা এ ঘটনাকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র শেখ হাসিনাকে ভারতের আরেক দফা প্রশ্রয় দেওয়ার উদাহরণ হিসেবেই দেখবে।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত অবশ্য বিষয়টিকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখেছেন। নিক্কেই এশিয়াকে তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ ও ভারত যখন ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়ে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য এসেছে।
শ্রীরাধা দত্তের মতে, পর্যটক ভিসা চালু হলেও দুই দেশের সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সম্পর্কের উন্নতিও খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তবে তিনি শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা হিসেবে দেখতে চান না। তার মতে, ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশই পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে লাভবান হতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। চুক্তি নবায়নের সময় গঙ্গায় বর্তমান পানিপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুই দেশের ওপর পড়া প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। দ্রুত চুক্তি নবায়ন করা গেলে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে। ডেভিড বার্গম্যান মনে করছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকতে এবং আওয়ামী লীগের জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে চান। মাইকেল কুগেলম্যানের বিশ্লেষণে অবশ্য আইনি লড়াই, রাজনৈতিক অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা বা রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে দেশে ফেরার সম্ভাবনাও রয়েছে। আর শ্রীরাধা দত্ত মনে করছেন, এই ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাবে।
তবে শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে তাকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং তার প্রত্যাবর্তনের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি কোন পথে যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু তার ঘোষণায় দেশের রাজনীতিতে নতুন করে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। তার প্রত্যাবর্তন একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।