Image description

দুর্নীতি দমন কমিশনই (দুদক) বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাসিব বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করেছে। অথচ এক বছর পর দুদকই লিখিতভাবে জানাল, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। আর এই চিঠির ওপর ভর করেই নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়েছেন আমিনুল হাসিব।

কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও নতুন টার্মিনাল নির্মাণে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি আমিনুল হাসিবসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পারস্পরিক যোগসাজশে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে আমিনুল হাসিবকে এই অনাপত্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতির মামলা চলমান থাকে, এই অবস্থায় অনাপত্তিপত্র দিয়ে দুদক নিজেই দুর্নীতি করেছে এবং দুর্নীতির সহায়ক হয়েছে।’

‘প্রাতিষ্ঠান হিসেবে দুদকের এই দুর্নীতি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়,’ উল্লেখ করে দায়ীদের জবাবদিহীতার আওতায় আনার ওপর জোর দেন ইফতেখারুজ্জামান।

মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, অনুমোদন প্রক্রিয়া পাশ কাটানো এবং অযোগ্য ও নন-রেসপন্সিভ প্রতিষ্ঠানকে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কাজ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এরোনেস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে কাজ করিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ‘ভাগ বাটোয়ারার মাধ্যমে আত্মসাৎ’ করা হয়েছে।

মামলার এক নম্বর আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক, সাবেক যুগ্ম সচিব জনেন্দ্র নাথ সরকার, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মালেক, প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান, এরোনেস ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম এবং বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ও এরোনেসের পরিচালক লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু।

আমিনুল হাসিব এই মামলার ৯ নম্বর আসামি। দুদকের নথি অনুযায়ী, তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ছিলেন।

একই মামলায় সাবেক প্রকল্প পরিচালক শরিফুল ইসলাম ও মো. শফিকুল ইসলাম এবং বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মো. ইউনুস ভূঁইয়াও আসামি।

অর্থাৎ, আমিনুল হাসিব কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ার কারণে নয়, বরং কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক হওয়ায় তিনি মামলাভুক্ত হয়েছেন। প্রকল্প পরিচালকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির সুযোগ থাকে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নথি বলছে, দুদকের মামলা দায়েরের প্রায় ১৩ মাস পর ঘটে উল্টো ঘটনা। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির জবাবে দুদক লিখিতভাবে জানায়, আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে দুদকে ‘কোনো মামলা তদন্তাধীন/বিচারাধীন নেই।’

এর আট দিন আগে দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেনসহ কমিশনাররা পদত্যাগ করেছিলেন।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আমিনুল হাসিবের পদোন্নতি-সংক্রান্ত এক চিঠির জবাবেই দুদক জানিয়েছিল তার বিরুদ্ধে মামলা নেই। তবে নিজেদের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিকে কীভাবে দুদক মামলামুক্ত দেখিয়ে চিঠি দিল, তার ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম ঘটনাটিকে সংস্থাটির নিজস্ব আইনেই গুরুতর অপরাধ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে মামলার আসামিকে দায়মুক্তি দেওয়া, পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি, সরকারকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, পারস্পরিক যোগসাজশ ও ঘুষ লেনদেনের মতো অপরাধের আলামত রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত দুদক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’

দুদকের এই চিঠির সাড়ে তিন মাস পর চলতি বছরের ৩০ জুন বেবিচক আমিনুল হাসিবকে চতুর্থ গ্রেডে পদোন্নতি দেয় এবং পরদিন তাকে সিভিল সার্কেল প্রকল্পে পদায়ন করে।

গণমাধ্যমে কথা বলার ক্ষেত্রে দাপ্তরিক বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ করে আমিনুল হাসিব এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

আমিনুল হাসিবের পদোন্নতি আদেশেই বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরবর্তীতে ‘বিরূপ/ভুল তথ্য’ পাওয়া গেলে পদোন্নতি সংশোধন বা বাতিলের অধিকার কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে।