বাংলাদেশে ১৮ হাজার ৪৫৩ জন ভারতীয় নাগরিক বৈধভাবে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে ৩,১১২ জনের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু তারা বিভিন্ন অজুহাতে নিজ দেশে ফেরত যাচ্ছেন না। তারা এখন বাংলাদেশে রয়েছেন অবৈধভাবে। তাদের বড় একটি অংশ গার্মেন্ট এবং বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত। এছাড়া দেশের বিভিন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, টেলিকম ও আইটি সেক্টর, বিভিন্ন সেক্টরের প্রকৌশলী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে তারা কর্মরত।
বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা ও থিংক ট্যাংক সংস্থাগুলোর মতে, বৈধভাবে বসবাসরতদের বাইরে বিভিন্ন সেক্টরে কয়েক লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। ট্যুরিস্ট বা অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে এসে পরবর্তী সময়ে ওভার-স্টে (ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থাকা) করার কারণে অবৈধ ভারতীয় কর্মীর সংখ্যা আরো বেশি। তাদের কোনো টিন সার্টিফিকেট নেই।
তথ্য মতে, তাদের বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল, প্রযুক্তি খাত, বায়িং হাউস, বিভিন্ন এনজিও এবং লজিস্টিকস খাতে কর্মরত। এসব ভারতীয় নাগরিকরা অবৈধভাবে থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার কারণে যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পন্ন বাংলাদেশি নাগরিকরা কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া তারা প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৪৯ হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাঠাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
দেশে অবস্থানরত ভারতীয়দের বেশিরভাগই এসেছেন অন অ্যারাইভাল ও ট্যুরিস্ট ভিসায়। তাদের মধ্যে যাদের ভিসার মেয়াদ অনেক আগে কিংবা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তাদের দ্রুত দেশত্যাগ বা ভিসা রিনিউ করার আহ্বান জানানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। তা সত্ত্বেও তারা এ বিষয়ে কর্ণপাত করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে এসব অবৈধ ভারতীয় নাগরিককে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তারা যাতে দ্রুত দেশত্যাগ করেন। যদি না যান, তাহলে ভিসা রিনিউ করার জন্য বলা হয়েছে। ভিসা রিনিউ না করলে তাদের ভারতে ফিরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনিক শক্ত উদ্যোগ না থাকার কারণে দেশে অবৈধ নাগরিকের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। তবে এর পেছনে বিভিন্ন বাস্তবতাও রয়েছে। দক্ষ ম্যানপাওয়ার না থাকার কারণে অনেক অবৈধ বিদেশি বাংলাদেশে চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন এবং সেই সুবাদে এখানে বসবাসও করছেন। এ ব্যাপারে তারা পুলিশকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। এখানে কিছু অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়ও জড়িত। তবে অবৈধভাবে থাকা এসব বিদেশি নাগরিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করতে পারেনÑএমন আশঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের বিশেষ শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, অবৈধভাবে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে। যদি তারা বৈধভাবে এখানে না থাকেন তাহলে দ্রুত তাদের নিজ দেশে ফেরত যেতে হবে। কোনো অজুহাত চলবে না।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এয়ার কমডোর (অব.) ইশফাক এলাহি চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ‘অবৈধ নাগরিক চিহ্নিত করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে প্রশাসনকে শক্ত উদ্যোগ নিতে হবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের ৩৩ ধরনের ভিসা দেওয়া হয়। তবে অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করছেন। বিশেষ করে ‘ভিসা অন অ্যারাইভাল’ এবং ব্যবসায়িক ভিসা ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিদেশি নাগরিক ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রথম ১৫ দিন দৈনিক এক হাজার টাকা করে জরিমানা দিয়ে দেশে অবস্থান করতে পারেন। ১৫ দিন পার হয়ে গেলে ৯০ দিন পর্যন্ত প্রতিদিনের জন্য দুই হাজার টাকা করে জরিমানা দিতে হয়। আর ৯০ দিনের বেশি হয়ে গেলে প্রতিদিনের জন্য তিন হাজার টাকা করে জরিমানার বিধান রয়েছে। জরিমানার অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দিয়ে দেশত্যাগ করতে পারেন।
সূত্র জানায়, গত ১৫ বছরে বিভিন্ন ধরনের ভিসা নিয়ে ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশে আসতে থাকেন। এসব ভিসার মধ্যে রয়েছেÑব্যবসা, বিনিয়োগ এবং পর্যটক ভিসা। অনেক ভারতীয় নাগরিকের তথ্য হালনাগাদ ছিল না। আবার অনেক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করেও ভিসার মেয়াদ বাড়াননি। আবার কেউ কেউ নতুনভাবে ভিসা নিলেও তার ডেটা এন্ট্রি করা হয়নি। ইমিগ্রেশন সিস্টেমে নতুন পাসপোর্ট ও ভিসা গ্রহণের তথ্য ছিল না। এসব আপডেটের কাজ চলমান রয়েছে। এখন পর্যন্ত তিন হাজার ১১২ জন অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।
এসবির এক কর্মকর্তা জানান, গাজীপুরের একটি গার্মেন্টে এক ভারতীয় নাগরিক টেক্সটাইল প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন। তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। তিনি নতুন করে ভিসা রিনিউ করেননি। পুলিশ ডেটা চেক করে তার কাছে গিয়ে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় ভিসা রিনিউ করার জন্য বলেছে। নইলে দ্রুত দেশত্যাগের জন্য বলা হয়েছে তাকে। ওই গার্মেন্টের মালিককেও বিষয়টি জানিয়েছে পুলিশ।
ভারত ছাড়াও অন্য দেশের অবৈধ নাগরিকদের চিহ্নিত করতে রাজধানী ঢাকা ও বাইরের জেলাগুলোয় কাজ করছে এসবির টিম।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে কিছু চলমান প্রকল্প রয়েছে। ওই প্রকল্পগুলোয় কাজ করছেন বেশকিছু ভারতীয় নাগরিক। তাদের ধরে দ্রুত দেশে পাঠিয়ে দিলে প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি থেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকল্পের কাজ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকির কারণে তাদের পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ঢাকার বাইরে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই অবৈধ নাগরিকরা চাকরি করছেন। পাশাপাশি আইটি ও টেলিকম সেক্টরেও অবৈধ ভারতীয় নাগরিকরা কর্মরত। পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের নতুন করে ভিসা রিনিউ করার জন্য বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ঢাকা এবং বাইরের একাধিক জেলায় কিছু বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করেছেন ভারতীয়রা। তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা নতুন করে রিনিউ করেননি। বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও শুধু বলছেনÑতারা দ্রুতই বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন। কিন্তু, এখনো বাংলাদেশ ত্যাগ করে যাননি তারা।
সূত্র জানায়, অবৈধভাবে দেশে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৬৪’-এর অধীন সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা করার বিধান রয়েছে। তবে দুর্বল আইনি কাঠামোর সুযোগ নিচ্ছেন অনেক বিদেশি নাগরিক।
এসবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ৮৩ হাজার ৬৮২ জন বিদেশি নাগরিক বৈধভাবে বসবাস করছেন।