ঢাবি হল ক্যানটিন
» উদ্বেগে আবাসিক শিক্ষার্থী এবং তাঁদের অভিভাবকেরা । » প্রশাসন ও হল সংসদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ শিক্ষার্থীদের । » ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে , কঠোর নজরদারি চলবে : প্রাধ্যক্ষ
তাঁদের অভিযোগ , স্বাস্থ্যবিধি মানা বা পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও বিশেষ উন্নতি দেখা যাচ্ছে না । গত ৩০ জুন শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী আল আরশাদ হাসান ক্যানটিনে ব্যবহৃত পানির জগ নিয়ে অভিযোগ করেন । তাঁর দাবি , ক্যানটিনের
" শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফলমূল পাচ্ছে না । ক্যানটিনের খাবারে ডাল বা মাছ - মাংসের পরিমাণ যা থাকে , তা দিয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয় । ড . মো . নিজামুল হক ভূঁইয়া অধ্যাপক , ঢাবি
কর্মচারীরা রান্নাঘরের ওয়াশরুমে গোসলের কাজে ব্যবহৃত জগ পরিষ্কার না করেই খাবারের সময় পানি পরিবেশন করতেন । অভিযোগটি তোলার পর হল সংসদের পক্ষ থেকে ক্যানটিন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় । হল প্রশাসন ক্যানটিন পরিচালককে বরখাস্ত করে । পরে
পরিষ্কার - পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে নতুন পরিচালকের মাধ্যমে ক্যানটিনটি আবার চালু করা হয় । তবে এই ঘটনার কিছুদিন পর ২১ জুলাই রাতে এই হলেরই পুরাতন ভবনের ক্যানটিনে পুঁইশাক ও মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় খাবারে কেঁচো পান এক শিক্ষার্থী । এ ঘটনায় ক্যানটিন পরিচালককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে হল প্রশাসন । একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে তাঁকে সতর্ক করা হয় । ১৬ জুলাই জসীমউদ্দীন হলের ক্যানটিনে পরিবেশিত হাঁসের মাংসের তরকারিতে ব্লেড পান হলের এক শিক্ষার্থী । এ ঘটনায় ক্যানটিন পরিচালককে তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার পর সতর্ক করা হয় । এ ঘটনার আগেও জসীমউদ্দীন হলের ক্যানটিনের খাবারে জোঁক এবং কাপড়ের টুকরা পাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল । জসীমউদ্দীন হলের ঘটনার ১১ দিন আগে গত ৫ জুলাই শহীদ সার্জেন্ট
জহুরুল হক হলের মূল ক্যানটিনের তরকারিতে ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেন এক শিক্ষার্থী । অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট ক্যানটিন তালাবদ্ধ করে হল সংসদ । ১২ জুলাই বিজয় একাত্তর হলের ক্যানটিনে পরিবেশিত সবজির মধ্যে বাসন মাজার স্ক্রাবারের অংশ পাওয়ার কথা জানান এক শিক্ষার্থী । ২০ জুলাই একই হলের ক্যানটিনের খাবারে পোকা পাওয়ার অভিযোগ করেন আরেক শিক্ষার্থী । সর্বশেষ গত শনিবার মাস্টারদা সূর্য সেন হল ক্যানটিনে খাসির ‘ ফ্যাপসা’র ( ফুসফুস ) তরকারিতে তেলাপোকা পাওয়ার অভিযোগ করেছেন হলের শিক্ষার্থী মো . জাহিদ ।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনার আগেও বিভিন্ন হলের ক্যানটিনের খাবারে দড়ি , রাবার ব্যান্ড , টাকার নোটের অংশ , মাছি , কাঁকড়ার অংশ এবং বিভিন্ন পোকামাকড় পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে । এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পুনরাবৃত্তি বন্ধ হচ্ছে না । বারবার খাবারে অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক বস্তু পাওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা । তাঁদের অভিযোগ , ক্যানটিন কর্মচারীদের অসচেতনতা এবং দায়িত্ববোধের অভাবের পাশাপাশি হল প্রশাসন এবং হল সংসদের যথাযথ তদারকির অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে । মাস্টারদা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আল আমিন বলেন , শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত খাবারের নামে অখাদ্য খাচ্ছে ।
কেঁচো , শামুক , পোকা , পচা ও বাসি খাবার নিত্যদিনের ঘটনা । বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ করে আল আমিন বলেন , এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো । হল সংসদ কিছুটা চেষ্টা করলেও তারা শতভাগ সফল নয় । খাবারের এই সমস্যার সমাধানে হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন । শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন বলেন , শিক্ষার্থীরা শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে এসব খাবার খায় । মূলত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতি এবং হল সংসদের অবহেলার কারণে এমন
পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে । খাবারে পোকামাকড় , ব্লেড কিংবা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর বস্তু পাওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড . মো . নিজামুল হক ভূঁইয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন , ক্যানটিনের খাবারে পোকামাকড় , ব্লেড কিংবা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর বস্তু পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক । এ ধরনের খাবার খেলে বিভিন্ন জীবাণুবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক তাৎক্ষণিক ক্ষতি হতে পারে । তাই ক্যানটিন পরিচালনাকারী , হল প্রশাসন এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক হতে হবে ।
ক্যানটিনের খাবারের সার্বিক পুষ্টিগুণ সম্পর্কে অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন , বর্তমানে যে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে , তাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ নেই । শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফলমূল প্রয়োজন , যা তারা পাচ্ছে না । ক্যানটিনের ডাল খুব পাতলা , তাই সেখান থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন মিলছে না । মাছ- মাংসের টুকরাও এত ছোট যে তা দিয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটানো অসম্ভব । ক্যানটিনের খাবারে ব্লেড পাওয়ার বিষয়ে জসীমউদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড . এস . এম আরিফ মাহমুদ বলেন , ঘটনার পর গঠিত কমিটির তদন্তে জানা যায় , রান্নার সময় বস্তার সুতা কাটতে ব্যবহৃত একটি ব্লেড অসাবধানতাবশত খাবারে পড়ে যায় ।
এ ঘটনায় ক্যানটিন পরিচালককে জরিমানা এবং এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে । এ ধরনের ঘটনা ঘটার কারণ ও সমাধান সম্পর্কে প্রাধ্যক্ষ বলেন , মূল সমস্যাটা হয় রান্নাঘরেই । বাবুর্চিদের আরও সচেতন করতে হবে এবং রান্নাঘর পরিষ্কার - পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে । ব্লেডের মতো অপ্রয়োজনীয় ধারালো বস্তু রান্নাঘরে রাখার বিষয়ে সতর্ক হতে হবে । জসীমউদ্দীন হলে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । মাস্টারদা সূর্য সেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড . রফিকুল ইসলাম বলেন , দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার ক্যাটারার পরিবর্তন করা হয়েছে । শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত
খাবার নিশ্চিত করা এবং খাবারে তেলাপোকা পাওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে । খাবারের মান নিশ্চিত করতে এবং তদারকি জোরদারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড . মো . নুরুল আমিন । আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন , রান্নাঘরের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে এবং ক্যানটিন পরিচালকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে । নিয়মিত তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । ভবিষ্যতে আবারও এ ধরনের ঘটনা ঘটলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।
হলের
মাস্টারদা সূর্যসেন সমাজসেবা সম্পাদক মোহাম্মদ আলী সাকিব বলেন , ‘ তেলাপোকা পাওয়ার বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে খাসির ফ্যাপসা বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয় । ক্যানটিন মালিককে ডেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে । ভবিষ্যতে আবার এমন কিছু ঘটলে ক্যানটিনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে । ” শেখ মুজিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি মোহাম্মদ মুসলিমুর রহমান বলেন , ‘ গোসলখানায় ব্যবহার করা জগ খাবার পানি পরিবেশনে ব্যবহারের বিষয়টি জানার পর আমরা ওই ক্যাটারারকে পরিবর্তন করিয়েছি ।
পরে পুরোনো ভবনের ক্যানটিনের অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসার পরও প্ৰয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হল প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছি । ' সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড . এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন , হল ক্যানটিনের খাবারে ব্লেড , পোকামাকড় বা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর বস্তু পাওয়ার ঘটনায় কোনো ছাড় নয় । এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনকে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । প্রয়োজনে চুক্তি বাতিল করতে বলা হয়েছে । একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা এড়াতে ক্যানটিন পরিচালনা ও তদারকিতে আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে ।