মাহমুদুর রহমান সম্পাদিত দৈনিক আমার দেশ-এর নাম ও লোগো ব্যবহার করে একের পর এক ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতার নামে ভুয়া উক্তি এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে ফেসবুকে Amar Desh সার্চ করে অন্তত ৫১টি এমন ভুয়া পেজ পাওয়া গেছে। এসব পেজের কিছুতে ছাত্রশিবির ও জামায়াতের পক্ষে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি ছাত্রদল ও যুবদলকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণাও চালানো হচ্ছে।
দৈনিক আমার দেশ-এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ‘Daily Amar Desh’। পেজটি ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর খোলা হয় এবং বর্তমানে এতে ১.৭ মিলিয়ন অনুসারী রয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ খোলা ‘Amar Desh’ নামের আরেকটি ফেসবুক পেজে বর্তমানে ১ লাখ ৩৮ হাজার অনুসারী রয়েছে। পেজটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সেখান থেকে নিয়মিত ছাত্রশিবির ও জামায়াতের পক্ষে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হয়। পাশাপাশি সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে ঘিরেও ধারাবাহিকভাবে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট ছড়ানো হয়।
যেমন, ৬ আগস্ট ওই পেজ থেকে একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, পলাতক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা বলেছেন, “বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিলো ওদের জন্য আমাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই।”
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, শেখ হাসিনা এমন কোনো বক্তব্য দেননি। প্রকৃতপক্ষে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট সাদিকুর রহমান খান নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, “বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই।” সেই বক্তব্যই শেখ হাসিনার নামে ভুয়া উদ্ধৃতি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
ছাত্রদল ও যুবদলকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা
এই একই পেজ থেকে ছাত্রদল ও যুবদলকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে একাধিক পোস্ট করা হয়েছে।
৫ আগস্ট এক পোস্টে দাবি করা হয়, “ঢাকা গ্রাফিক্স কলেজের হল দখলে নিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হা/ম/লা চালাচ্ছে স/ন্ত্রা/সী ছাত্রদল।”
এর আগের দিন, ৪ আগস্টও ছাত্রদল ও যুবদলকে সন্ত্রাসী উল্লেখ করে আরেকটি পোস্ট প্রকাশ করা হয়।
এছাড়া ২ আগস্ট আরেকটি পোস্টে দাবি করা হয়, “ছাত্রলীগ থেকে জনপ্রতি দুই লাখ টাকা করে নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে সুযোগ করে দিচ্ছে ছাত্রদলের রাকিব ও নাসির।”
জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের পক্ষে প্রচারণা
পেজটির পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের পক্ষে প্রচারণাও চালানো হয়েছে।
২ আগস্ট এক পোস্টে লেখা হয়, “জামায়াতকে তিনবার নিষিদ্ধ করা তিন শাসক—এই হচ্ছে ফ্যাসিস্ট, সবারই হয়েছে করুন পরিণতি। এরপরেও জামায়াত এগিয়ে গিয়েছে।”
এছাড়া ২৮ জুলাই আরেকটি পোস্টে বলা হয়, “শিবির কি গুপ্ত? তারা রগ কা'টে? ছাত্রশিবির সম্পর্কে ১৫০+ জন নারী শিক্ষার্থীর মন্তব্য শুনুন।”
এছাড়াও পেজটি থেকে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি নেতাদের ফাঁস হওয়া আপত্তিকর ভিডিওও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
একই ধরনের আরেকটি পেজের নাম ‘Daily Amader Desh’। যদিও পেজটির নাম আমাদের দেশ, তবুও সেখানে আমার দেশ-এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের লোগো ও কাভার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, আমার দেশ-এর ফটোকার্ডের নকশা হুবহু নকল করে একাধিক ভুয়া ফটোকার্ডও প্রচার করা হয়েছে।
৪ আগস্ট ওই পেজ থেকে আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ছবি সংযুক্ত করে একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, “ছাত্রলীগের মতো ছাত্রদলকেও নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে। ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।”
ফটোকার্ডটিতে ৮৫ হাজারের বেশি রিয়্যাক্ট এবং ৮ হাজারের বেশি মন্তব্য পড়েছে। মন্তব্যগুলোর মধ্যে অনেকেই ভুয়া ফটোকার্ডটিকে সত্য মনে করে আমার দেশ এবং এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সমালোচনা করেছেন।
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, মাহমুদুর রহমান এমন কোনো বক্তব্য দেননি। পরদিন, ৫ আগস্ট, আমার দেশ-এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও জানানো হয়, তাঁর নামে প্রচারিত এই উক্তিটি ভুয়া।
২১ জুলাই একই পেজ থেকে আরেকটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়,“ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এআই দ্বারা তৈরি মেয়েকে বিয়ে করলেন এমপি নজরুল ইসলাম।”
এই দাবিটিও ভুয়া। দ্য ডিসেন্ট এর আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ভাইরাল ভিডিওটি এআই-নির্মিত নয়; তবে দ্বিতীয় স্ত্রী সংক্রান্ত দাবিটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া ১৬ জুলাই আরেকটি ফটোকার্ডে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নামে দাবি করা হয়, “ভারত আমাদের অপছন্দ করলেও আমরা তাদেরকে পছন্দ করি।”
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, শফিকুর রহমান এমন কোনো মন্তব্য করেননি।
এর আগে, ৮ জুলাই একই পেজে আরেকটি পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, “আর্জেন্টিনার ৩য় গোলটি কে অবৈধ বললেন জামায়াত আমীর।”
এই দাবিটিও মিথ্যা। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এমন কোনো মন্তব্য করেননি।
দ্য ডিসেন্টের যাচাই এ দেখা গেছে, ফেসবুকে Amar Desh সার্চ করলে অন্তত ৫১টি পেজ পাওয়া যায়, যেখানে আমার দেশ-এর নাম, লোগো কিংবা ব্র্যান্ড পরিচিতি ব্যবহার করা হয়েছে।
এসব পেজের অনেকগুলোতে ভুয়া ফটোকার্ড, মনগড়া উক্তি এবং রাজনৈতিক বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
আমার দেশের অনলাইন এডিটর মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমার দেশের নামে অসংখ্য ভুয়া পেজ তৈরি করে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আমাদের নাম, লোগো ব্যবহার করে একই রকম ফটোকার্ড ব্যবহার করা হচ্ছে, ফলে অনেক পাঠক ভুয়া ফটোকার্ডকেও আমার দেশের সত্যিকারের খবর বলে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।”
আমার দেশের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ভেরিফাইড না কেন জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, “আমরা ভেরিফাই ব্যাজের জন্য আবেদন করেছি। মেটার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি এবং অপেক্ষায় আছি; আশা করা যায় যেকোনো সময়ই এটি পেয়ে যাব।”