বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে এই পদে থাকা ব্যক্তির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব। আগামী ২০ আগস্ট হচ্ছে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন দেশের একজন সাধারণ নাগরিক কি সরাসরি রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন? নাকি এর জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোটে হয় না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর পরে মনোনয়নপত্র জমা ও ভোট গ্রহণের দিন তারিখ ঘোষণা করবে ইসি। মূলত প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হয়। ভোট অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে সংসদ ভবনে।
অর্থাৎ কোনো নাগরিক নিজে থেকে সাধারণ নির্বাচনের মতো রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের সর্বোচ্চ এই পদটি শূন্য হয়েছে। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এই পরিস্থিতিতে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন কে এই পদে প্রার্থী হতে পারেন এবং কী যোগ্যতা প্রয়োজন?
আসুন জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশের সংবিধান কি বলছে-
রাষ্ট্রপতি হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হয়। একজন প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য প্রার্থীর বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৩৫ বছর। এছাড়া কেউ যদি আগে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সংবিধান অনুযায়ী অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারিত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য যোগ্য হবেন না।
তবে তার মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজনকে সমর্থক হতে হবে। প্রার্থীর নিজেরও সম্মতিসূচক স্বাক্ষর থাকতে হবে। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে কার্যভার গ্রহণের দিন তার সংসদীয় আসন শূন্য হবে। বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোট নেওয়া হবে।
সাধারণ নাগরিক কি প্রার্থী হতে পারেন?
সংবিধানের দৃষ্টিতে এই বিষয়টি এতটা সহজভাবে দেখার সুযোগ নাও হতে পারে। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি সাধারণ নাগরিক ভোট দেন না। তবে কোনো ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রপতি হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতা পূরণ করেন, তাহলে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া যেতে পারে। সাধারণত রাজনৈতিক দল, সংসদ সদস্য বা সংশ্লিষ্ট মহল থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আসে।
অর্থাৎ, একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়। কিন্তু তার জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের সমর্থন পেতে হবে। যদিও ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ নেই।
নির্বাচন প্রক্রিয়া কীভাবে হয়?
আসুন এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হয় তা জেনে নেওয়া যাক-
প্রথমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে। এরপর প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে জাতীয় সংসদ সদস্যরা ভোট দেন। যিনি সংসদ সদস্যদের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান, তিনিই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন, তাহলে ভোটের মাধ্যমে একজনকে বেছে নেওয়া হয়। আর যদি কোনো নির্বাচনে একজন প্রার্থীই বৈধ থাকেন, তাহলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হতে পারে।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট কিন্তু গোপন নয়, প্রকাশ্য। এখানে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট থাকে। ভোটার ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে স্বাক্ষর করে সেটি সংগ্রহ করেন। এরপর যাকে ভোট দেবেন, তার নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করেন। সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থী নির্বাচিত হন। দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা একবারই ঘটেছিল। সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনেই একমাত্র ভোটাভুটি হয়েছিল। বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর প্রতিটি নির্বাচনে একজন বৈধ প্রার্থী থাকায় আর ভোটের প্রয়োজন হয়নি।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি একই সঙ্গে সংসদ সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন না। যদি কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তাহলে তাকে সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হয়।
প্রশ্ন হতে পারে কেন সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ নেই?
আসলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি ভিন্ন। কোথাও জনগণের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, আবার কোথাও সংসদ বা বিশেষ নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচন হয়। বাংলাদেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরোক্ষ পদ্ধতিতে হয়ে থাকে।
রাষ্ট্রপতি মূলত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। অন্যদিকে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিও সেই সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। দেশের যে কোনো যোগ্য নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে। তবে বাস্তবে সেই পদে পৌঁছাতে হলে শুধু যোগ্যতা থাকলেই হয় না; সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থী হতে হবে এবং জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হতে হবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের মতো জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয় নয়, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।