জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে জামালপুরের রাজপথে প্রকাশ্যে যে আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া দেখা গিয়েছিল, তার অধিকাংশ অস্ত্রেরই দুই বছর পরও কোনো সন্ধান মেলেনি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে অস্ত্র হাতে দেখা যাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অস্ত্র উদ্ধার ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় জনমনে প্রশ্ন বাড়ছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় জামালপুর শহরে আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শনের একাধিক ঘটনা ঘটে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শুধু লাঠিসোঁটা বা দেশীয় অস্ত্র নয়, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়েও রাজপথে অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট শহরের নতুন হাইস্কুল মোড়, কলেজ রোড ও আশপাশের এলাকায় সংঘটিত ঘটনাটি এখনো আলোচিত। সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল বকুলতলার দিকে অগ্রসর হলে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বাধা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হলে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারহান আহমেদের হাতে একটি শর্টগান সদৃশ আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। একই সঙ্গে নাফিজুর রহমান তুষার ও শাহরিয়ার ইসলাম রাফির হাতেও পিস্তল সদৃশ অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোতে তাদের অস্ত্র হাতে অবস্থান ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
ঘটনার প্রায় তিন মাস পর ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর জামালপুর সদর থানায় একটি অস্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। এসআই মিঠু বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় ফারহান আহমেদ, নাফিজুর রহমান তুষার ও শাহরিয়ার ইসলাম রাফির নাম উল্লেখসহ আরও কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং আন্দোলনকারীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
কিন্তু মামলার দুই বছর পরও আলোচিত অস্ত্রগুলোর অধিকাংশ উদ্ধার হয়নি। আন্দোলনকারীদের প্রশ্ন,
যে অস্ত্রের ছবি ও ভিডিও পুরো দেশ দেখেছে, সেই অস্ত্রগুলো কোথায় গেল? সেগুলোর বৈধ লাইসেন্স ছিল কি না, কারা সরবরাহ করেছিল এবং কোথায় গোপন করা হয়েছে এসব প্রশ্নেরও কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৭ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত শহরের কলেজ রোড, ফৌজদারি মোড়, দয়াময়ী, স্টেশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেল বহর নিয়ে শক্তি প্রদর্শন করে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে একাধিকবার।
আন্দোলনসংশ্লিষ্টদের দাবি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিজন কুমার চন্দ, শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন পৌর মেয়র ছানোয়ার হোসেন ছানু এবং জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারহান আহমেদের নেতৃত্বে শহরজুড়ে সশস্ত্র মোটরসাইকেল মহড়া পরিচালিত হয়। তাদের নেতৃত্বেই আন্দোলন প্রতিহতের চেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, তারা খালি হাতে আন্দোলন করলেও তাদের সামনে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল। আজও সেই ঘটনার বিচার ও অস্ত্র উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
জামালপুর জেলা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক আমিমুল ইহসান বলেন, ‘২০২৪ সালের ৩ আগস্ট হাইস্কুল মোড়ে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারহান আহমেদ শর্টগান এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা প্রকাশ্যে পিস্তলসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। দুই বছরেও অস্ত্রগুলো উদ্ধার ও আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। অবিলম্বে অস্ত্র উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে হবে।’
মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করলেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদঘাটন সম্ভব। একই সঙ্গে অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।’
তার মতে, এটি কেবল রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগের পরও যদি অস্ত্র উদ্ধার না হয়, তাহলে জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বিজন কুমার বিশ্বাস বলেন, আমার আগে আরো ৩জন মামলার তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন। মামলার তদন্ত শেষে ৭০ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জামালপুর সদর থানার ওসি নাজমুল সাকিব বলেন, ‘এটি আমার যোগদানের আগের ঘটনা। মামলার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রদর্শিত অস্ত্রগুলো উদ্ধার এবং অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে তাই প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে, যে অস্ত্রের ছবি পুরো দেশ দেখেছে, সেই অস্ত্রগুলো আজ কোথায়? আর প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেওয়া সবাই কি সত্যিই আইনের আওতায় এসেছে?