ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের তীব্র আবাসন সংকট নিরসন, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা এবং একটি সুরক্ষিত ও শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তিন দফা দাবি উপস্থাপন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও বিভিন্ন হল সংসদ।
আজ রবিবার (২৬ জুলাই) ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব দাবি ও তার বাস্তবসম্মত সমাধান রূপরেখা পেশ করেন।
প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানানো হয়, ডাকসুর মেয়াদ শুরুর পর থেকে শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক প্রস্তাব ও অর্থায়নের উৎস প্রস্তুত রাখা সত্ত্বেও প্রশাসনের চরম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সমন্বয়হীনতা ও উদাসীনতার কারণে অধিকাংশ উদ্যোগই আটকে রয়েছে।
ডাকসুর কর্তৃক উত্থাপিত তিন দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস বিনির্মাণ।
ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপির সহযোগিতায় ১০০ জন ভলান্টিয়ার নিয়োগ এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদারের অনুমোদন আনা হলেও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে তা এখনও কার্যকর হয়নি।
এছাড়া ছাত্রী হলগুলোতে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধে সম্পূর্ণ নিজস্ব স্পন্সরের মাধ্যমে আধুনিক ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি গেট’ (আইডি কার্ড পাঞ্চ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ফেস রিকগনিশন সুবিধা সংবলিত) স্থাপনের অর্থায়ন নিশ্চিত করা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনের অসহযোগিতায় প্রকল্পটি আটকে আছে। একই সঙ্গে নারী শিক্ষার্থীদের রাতে হলে প্রবেশের নিয়ম শিথিল ও অহেতুক হয়রানি বন্ধ, অনাবাসিক ছাত্রীদের স্ব স্ব হলে প্রবেশের সুযোগ, সুফিয়া কামাল হলের পাশের ফুটওভার ব্রিজ অপসারণ, ফজলুল হক মুসলিম হলে স্থায়ী পুলিশ পোস্ট স্থাপন এবং শাহবাগ থানায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার আসামীদের শাস্তির দাবি জানানো হয়। সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকার পরও মেয়েদের জিমনেসিয়াম চালু না হওয়া এবং কেন্দ্রীয় মসজিদের অচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে ডাকসু।
শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত খাদ্য ও নিরাপদ সুপেয় পানি নিশ্চিতকরার দাবিও জানিয়েছে ডাকসু। শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে স্যানিটেশন খাতের সুনির্দিষ্ট বাজেট যথাযথ ব্যবহারের জোর দাবি জানান ছাত্রপ্রতিনিধিরা। ডাকসুর নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের কম দামে খাবার দিতে টিসিবির (TCB) যে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, প্রশাসন তা নবায়ন করেনি বলে অভিযোগ করা হয়।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল, মোকাররম ভবন, এনেক্স ভবন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে নতুন ক্যান্টিন চালু ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও স্পেস বরাদ্দ কমিটির দীর্ঘসূত্রতায় তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। প্রতিটি হলে নিয়মিত সুপেয় পানির মান পরীক্ষার আহ্বান জানান নেতারা।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান ও সিট নীতিমালা প্রণয়নে দাবিও জানায় ডাকসু নেতারা।যেখানে আবাসন সংকট দূর করতে চলমান ২,৮৪১ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়। ডাকসু নেতারা অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রশাসন পর্যালোচনার নামে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করায় আবাসন সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
একই সাথে অছাত্র ও বহিরাগতদের হল থেকে উচ্ছেদ করে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিতে একটি স্বচ্ছ ‘সিট নীতিমালা’ প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
ডাকসু নেতাদের দাবিসমূহ শোনার পর উপাচার্য এগুলো দ্রুত পর্যালোচনার মাধ্যমে কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
তবে ডাকসু নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট জানিয়েছেন, অতীতেও বারবার আশ্বাসের মুখে পড়ে শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হয়েছে। তাই এবার দাবি আদায়ে তারা প্রতিটি হল ও বিভাগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গণসংযোগ ও মতবিনিময় শুরু করবেন। প্রয়োজন হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে এসব যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নে প্রশাসনকে বাধ্য করা হবে।