নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মিন্টু মিয়া (৫১) জমি বিক্রি ও ঋণ করে কম্বোডিয়া গিয়েছিলেন গত বছরের জানুয়ারিতে। প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেখানে তিনি রেস্টুরেন্টের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই সড়কের জায়গায় হওয়ায় রেস্টুরেন্টটি ভাঙা পড়ে। এরপর তড়িঘড়ি করে তিনি এক কম্বোডিয়ান নাগরিকের সঙ্গে যৌথ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। তবে এবারও তিনি প্রতারণার শিকার হন। এর ১৫ দিন পর গত বছরের ২৬ আগস্ট মানসিক যন্ত্রণায় কাতর মিন্টু স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার মত্যুর পর অবশিষ্ট সবকিছুই লুটে নেয় অজ্ঞাতরা। এরপর শুরু হয় পরিবারের সদস্যদের সীমাহীন ভোগান্তি। লাশ পেতে সময় লেগে যায় প্রায় এক বছর। নানা জটিলতার পর রোববার (২৬ জুলাই) দুপুরে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তার লাশ দেশে এসেছে।
জানা গেছে, কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন স্ট্রোকে আক্রান্ত মিন্টু মিয়া। তার লাশ দেশে আনতে পরিবারের সদস্যরা চার মাস চেষ্টা করেও সফল হয়নি। কারণ তিনি ভ্রমণ ভিসায় ভিয়েতনাম যাওয়ার পর বিজনেস ভিসা নেন। ফলে বাংলাদেশের ওয়ার্কপারমিট না থাকায় তিনি দেশে নথিভুক্ত ছিলেন না। এই জটিলতা মোকাবিলা করে লাশ পাঠানোর জন্য বিভিন্ন পক্ষ ৭ থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার (৯ লাখ টাকার বেশি) দাবি করে। ঋণে জর্জরিত পরিবারের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা ছিল প্রায় অসম্ভব। কারণ মিন্টু মিয়াই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুর পর পরিবারটি চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর মিন্টু মিয়ার স্ত্রী তোফা খানম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উইটনেস ফাউন্ডেশনে আবেদন করেন। ৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে প্রয়োজনীয় আবেদন জমা দেয়। এরপর সংশিষ্ট সরকারি দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সমন্বয় ও ধারাবাহিক অনুসরণের মাধ্যমে সরকারি তহবিলের সহায়তায় লাশ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
মিন্টুর জীবন ছিল সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা
স্ত্রী তোফা খানম যুগান্তরকে জানান, মিন্টু প্রায় ২১ বছর আমেরিকার অধীনস্ত দ্বীপ সাইপেনে ছিলেন এবং সেখানে তার সাজানো সংসার ও ব্যবসা ছিল। কিন্তু তার স্ত্রী পরকিয়ায় জড়িয়ে তাকে ডিভোর্স দেন। এতে তিনি ক্ষোভ ও অভিমানে সবকিছু ফেলে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে চলে আসেন। দেশে ফেরার পর তিনি আবারও বিদেশে থিতু হওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র মাইক্রোনেশিয়া যান। সেখানে প্রায় দুই-আড়াই বছর অবস্থান করে ব্যবসার চেষ্টা করলেও সফল হতে পারেননি। এরপর ফের দেশে ফিরে আসেন। ২০২১ সালে তিনি তোফা খানমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে কম্বোডিয়ায় নতুন করে ব্যবসা শুরু করার জন্য তিনি জমিজমা বিক্রি করে প্রায় ৩০ লাখ টাকা জোগাড় করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন উৎস থেকে অন্তত ২২ লাখ টাকা ঋণও নিয়েছিলেন। কিন্তু কম্বোডিয়ার ব্যর্থতা তাকে ঘিরে ফেলে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মিন্টু মিয়া অবশেষে স্ট্রোক করে মারা যান।
উইটনেস ফাউন্ডেশনের কমিউনিকেশন কো-অর্ডিনেটর রাগীব হাসান যুগান্তরকে বলেন, অভিবাসীদের অধিকার, নিরাপদ অভিবাসন এবং সংকটে পড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা সংগঠনটি বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। এরপর সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ, সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে প্রায় এক বছর পর মিন্টু মিয়ার লাশ দেশে আনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।