Image description

দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, মামলা, হামলা, কারাবরণ, নির্বাসন আর প্রতিকূল রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে অবশেষে ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজপথের সংগ্রাম থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসা দলটির জন্য এই ১৭ বছর ছিল ইতিহাসের কঠিন এক অধ্যায়। তবে নির্বাচনি লড়াইয়ে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সূচনা হয়েছে এক নতুন দিগন্তের।

 

তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি বিএনপির সামনে এখন এসে দাঁড়িয়েছে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ—জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত দলটিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে সুসংগঠিত করা।

 

এদিকে সরকার পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে চলে গেছেন দলের অনেক অভিজ্ঞ ও শীর্ষ নেতা। ফলে আন্দোলনমুখী মেজাজের এই বিশাল সংগঠনটিকে এখন রূপ দিতে হচ্ছে একটি সুসংহত শাসক দলের কাঠামোতে। এই বাস্তবতায় দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর চলতি বছরই দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।

 

বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রথম জাতীয় কাউন্সিল হবে। সেই কারণেই দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা, আগ্রহ ও প্রত্যাশা। দীর্ঘ বিরতির পর এবারের কাউন্সিল দল পুনর্গঠন ও আগামী দিনের কর্মপন্থা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।

 

দলের সাংগঠনিক কাঠামোর গতিশীলতা ও দলকে সুসংগঠিত করতে জাতীয় কাউন্সিলের দিন-তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও, আগামী ডিসেম্বরে এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। দীর্ঘ ৯ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই কাউন্সিল সামনে রেখে জেলা কমিটির পাশাপাশি এর আওতাধীন অধস্তন কমিটিগুলো সম্পূর্ণ করার কার্যক্রম জোরেশোরে শুরু করেছেন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা।

 

বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় রাজপথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম—কাউন্সিলের মাধ্যমে এমন এক শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চান বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

বিএনপি নেতারা বলছেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন বিষয়ে এবারের কাউন্সিলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিগত দিনের সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদেরই দল পরিচালনার মূল দায়িত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া কাউন্সিলের আগেই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এবং যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।

 

দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও সেই বৈঠক থেকে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

 

বিএনপির আরেক সূত্র জানায়, কাউন্সিল সামনে রেখে দলের মহাসচিব পরিবর্তনের বিষয়টিও এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। অনেকেই আভাস দিয়েছেন যে নতুন মহাসচিব খোঁজা হচ্ছে। মহাসচিব পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির শূন্য পদগুলোও পূরণ করা হবে। এ ছাড়া কাউন্সিলে সম্পাদকমণ্ডলী এবং নির্বাহী কমিটিতেও ব্যাপক রদবদল আসবে। তবে সম্পূর্ণ বিষয়গুলো নির্ভর করছে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর; তিনিই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

 

দলের একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, সংগঠনের গতিশীলতা বাড়াতে জাতীয় কাউন্সিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই কাউন্সিল সম্পন্ন করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দলের কাউন্সিলের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এটি সত্যি যে কাউন্সিল দলের ভেতরের সাংগঠনিক গতিশীলতা অনেক বৃদ্ধি করে।’

 

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তারেক রহমান এখন শুধু দলের চেয়ারম্যান নন, উনি তো প্রধানমন্ত্রীও বটে। প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যেও দলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি সব সময় খবর রাখছেন এবং দলের চেয়ারম্যান হিসেবে যে সিদ্ধান্তগুলো দেওয়া দরকার, সেগুলো নিয়মিত দিচ্ছেন।’

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনের ফলে আমাদের বিএনপির নেতাকর্মীরা সেভাবে অগ্রসর হতে পারে নাই। রাজপথে ও বিরোধী দলে যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আমার বিশ্বাস এবারের কাউন্সিলে দল তাদেরই সঠিক মূল্যায়ন করবে।’

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও গতিশীল করতে আমরা জাতীয় কাউন্সিলের কথা ভাবছি। তবে সেটি ডিসেম্বরেই হবে, এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপি দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল, তাই জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করতে ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আমরা যত দ্রুত সম্ভব একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল কাউন্সিল আয়োজন করব।’

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সংসদ সদস্য আশাবাদ ব্যক্ত করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ডিসেম্বরে জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে এবং সে লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

 

দলীয় নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের সময়সূচি চূড়ান্ত না হলেও বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতির অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই কাউন্সিলের চূড়ান্ত তারিখ ও এজেন্ডা নির্ধারণ করা হবে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় বিরোধী দলে থেকে রাজপথে লড়াই করার পর ক্ষমতায় এসে দলকে পুনর্গঠন করা যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক পরীক্ষা। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া আর শাসক দল হিসেবে প্রশাসন ও রাজপথের ভারসাম্য রক্ষা করার কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিএনপির এই সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল কেবল একটি নেতৃত্ব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি রাজপথের 'আন্দোলনমুখী মেজাজ' থেকে দলকে একটি দায়িত্বশীল 'শাসক দলের কাঠামোতে' রূপান্তরের ঐতিহাসিক সেতু।

 

তারেক রহমানের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতাদের কাজে লাগানো, অন্যদিকে রাজপথের ত্যাগী ও তরুণ কর্মীদের পদায়ন করে দলকে ঝালিয়ে নেওয়া। ডিসেম্বরের কাউন্সিল যদি সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়, তবে তা বিএনপির সাংগঠনিক ভিতকে যেমন শক্তিশালী করবে, তেমনি নতুন সরকারকে রাজপথ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দিক থেকে একটি শক্ত রাজনৈতিক ঢাল প্রদান করবে।’

 

একনজরে বিএনপির আগের কাউন্সিলে যারা ছিলেন দায়িত্বে

বিএনপির বিগত কাউন্সিলগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথম কাউন্সিল (১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮): তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক পথ ও মতের অনুসারীদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকার রমনা বটমূলের খোলা চত্বরে প্রথম সম্মেলনে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব হন।

 

দ্বিতীয় কাউন্সিল (ফেব্রুয়ারি, ১৯৮২): জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে চেয়ারম্যান ও মহাসচিব হন যথাক্রমে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

 

তৃতীয় কাউন্সিল (মার্চ, ১৯৮৯): প্রায় সাত বছর পর অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে প্রয়াত খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং সালাম তালুকদার মহাসচিব নির্বাচিত হন।

 

চতুর্থ কাউন্সিল (সেপ্টেম্বর, ১৯৯৩): চার বছর বিরতি দিয়ে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া মহাসচিব হন।

 

পঞ্চম কাউন্সিল (৮ ডিসেম্বর, ২০০৯): দীর্ঘ ১৬ বছর পর অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং অ্যাডভোকেট খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মহাসচিব নির্বাচিত হন।

 

ষষ্ঠ কাউন্সিল (১৯ মার্চ, ২০১৬): সর্বশেষ অনুষ্ঠিত এই ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তৃতীয়বারের মতো খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত থেকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।