রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন মহল থেকে তাঁকে পদচ্যুত করার দাবি উঠেছিল।
এরপর নানা সময়ে তাঁর পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন, তাঁর ‘নজরবন্দি’ থাকার গুঞ্জন এবং শারীরিক অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য পদত্যাগের খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। সম্প্রতি সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে আবারও তাঁর পদ নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে।
শুরুতেই বিতর্ক: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়ন জমা না দেওয়ায় নির্বাচন কমিশন তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে।
বাংলাদেশে এটি নতুন ঘটনা ছিল না। এর আগেও একাধিক রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, সংসদে একদলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। ফলে তাঁর নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয় দায়িত্ব গ্রহণের আগেই।
শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম: একটি ছবি, দীর্ঘ বিতর্ক
রাষ্ট্রপতি হওয়ার অনেক আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম করেন সাহাবুদ্দিন। সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ছবিটি নতুন করে ভাইরাল হয়। সমালোচকদের বক্তব্য ছিল, একজন রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে নিরপেক্ষতার প্রতীক হওয়ার প্রত্যাশা থাকে। সেই জায়গায় এমন একটি ছবি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতারা এটিকে ব্যক্তিগত সম্মান প্রদর্শনের বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং বলেন, এটি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়।
‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ’ মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থাপক নবনীতা চৌধুরীর একটি ছবিতে সাহাবুদ্দিনের আইডি থেকে করা ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাক্টিভ’ মন্তব্যের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়।
মন্তব্যটি সত্যিই তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে করা হয়েছিল কি না, সেটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়। তবে স্ক্রিনশটটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
এটি রাষ্ট্রীয় কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও জনপরিসরে যে কৌতূহল ও সমালোচনা তৈরি হতে পারে, এই ঘটনাটি তার একটি বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসকে শপথ পড়ান মো. সাহাবুদ্দীন। ছবি: সংগৃহীত
২০২৪: ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে শপথ পড়ানো
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টাদের শপথ বাক্য পাঠ করান।
এই ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মুহূর্ত। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা তখন কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। যদিও শপথ অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, এরপরই শুরু হয় আরও বড় বিতর্ক।
একটি সাক্ষাৎকার, অনেক বিতর্ক
২০২৪ সালের অক্টোবরে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নেই এবং তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় পাননি।
এই বক্তব্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। কারণ ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান বলেছিলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে সেই বিবরণ নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলেন, রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে দেওয়া বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করেন, এমন সংবেদনশীল বিষয়ে রাষ্ট্রপতির প্রকাশ্য মন্তব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ও বঙ্গভবন ঘেরাও
সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রনেতারা এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচিও পালন করেন। নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে এ ধরনের আন্দোলন খুবই বিরল। ফলে ঘটনাটি রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানকে নিয়েই নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
সরকারের ভেতর থেকেও আসে ভিন্ন সুর
এই বিতর্কের সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি না করাই উচিত। তাঁর বক্তব্য ছিল, সরকার পরিবর্তনের বাস্তবতা এবং পরবর্তী সাংবিধানিক কার্যক্রমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একই সময়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও বলেন, এখন মূল বিষয় হওয়া উচিত রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচন; পদত্যাগপত্র আছে কি নেই—এ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কে আটকে থাকা সমাধান নয়।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও মূলত একই ধরনের বার্তা দেওয়া হয়—পদত্যাগের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘায়িত না করার আহ্বান জানানো হয়।
ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
রাষ্ট্রপতিকে সরানো হবে কি না—সাংবিধানিক বিতর্ক
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠে, তাঁকে সরানো সম্ভব কি না। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে সে সময় অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন, রাজনৈতিক দাবি থাকলেও সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে সরানো সহজ নয়। ফলে রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।
নতুন সংসদ, নতুন বিতর্ক
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির সংসদ ভাষণ নিয়েও নতুন বিতর্ক দেখা দেয়।
সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার সময় বিরোধী দল রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করে। একপর্যায়ে বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউটও করেন। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শেষ হয়নি; বরং নতুন সংসদেও তা ফিরে আসে।
কেন এত বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন সাহাবুদ্দিন
বাংলাদেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি তাঁদের সাংবিধানিক সীমার মধ্যেই থেকেছেন এবং খুব কমই সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছেন।
সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা কিছু ঘটনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো কার্যকলাপ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তাঁর সাংবিধানিক ভূমিকা এবং পরে দেওয়া সাক্ষাৎকার—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হন, যাঁকে ঘিরে বিতর্ক কখনোই পুরোপুরি থামেনি।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ সাধারণত সংবাদ শিরোনাম হয় না। কিন্তু সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর মেয়াদ দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সংকটের সময়ে রাষ্ট্রপতির একটি বক্তব্যও কীভাবে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। তাঁর নাম হয়তো ভবিষ্যতে শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য নয়, বরং ধারাবাহিক বিতর্ক, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানের সীমা ও ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলার জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।