শরীয়তপুরের জাজিরার জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে মাত্র ১০ টাকার ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের রসিদ দিতে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তহশিলদার লিটন দেওয়ানের বিরুদ্ধে।
অতিরিক্ত অর্থ ফেরত চাইতে গেলে ভুক্তভোগীকে অফিসে আটকে রেখে মামলার ভয় দেখানো এবং কোনো টাকা নেওয়া হয়নি, এমন বক্তব্য দিতে বাধ্য করারও অভিযোগ রয়েছে। পরে স্থানীয়দের বিক্ষোভ ও অবরোধের মুখে অভিযুক্ত তহশিলদার ওই টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন।
এদিকে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্তর অপসারণের দাবি জানান স্থানীয় ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। আর তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস জেলা প্রশাসনের।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি জমি বিক্রির জন্য নতুন অর্থবছরের খাজনার রসিদ তুলতে জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান উপজেলার চর খোড়াতলা এলাকার বাসিন্দা আজিজুল হক। এসময় খাজনার রসিদ পেতে বিভিন্ন টালবাহানার একপর্যায়ে তহশিলদার লিটন দেওয়ান বিকাশের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। পরে হাতে পাওয়া সরকারি রসিদে করের পরিমাণ মাত্র দশ টাকা দেখে আজিজুল হক অতিরিক্ত অর্থ ফেরত চান।
তার অভিযোগ, টাকা ফেরত চাইতেই তাকে অফিসে আটকে রেখে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি তার কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি এমন বক্তব্যও জোরপূর্বক ধারণ করা হয়।
এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। শত শত মানুষ জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জড়ো হয়ে অভিযুক্ত তহসিলদারকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে স্থানীয়দের চাপে তিনি ২০ হাজার টাকা ফেরত দেন। এ ঘটনার ভিডিও গত দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সামনে ক্ষুব্ধ মানুষের ভিড়। ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা দরজা বন্ধ করে রেখেছেন। অনেকে লোহার দরজাটি খুলে তাকে টেনে বের করার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ ঘটনাটি মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছেন। এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী আজিজুল হককে বের হয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘এখানে যারা সেবা নিতে আহে সবাইকে ভাবে বলদ। আমার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিছে। আমার মোবাইল থিকা দিছি। প্রথমে অস্বীকার কইরা এহন আবার স্বীকার করে টাকা ফেরত দিছে।’
ভুক্তভোগী আজিজুল হক অভিযোগ করে বলেন, ‘গত বছর খাজনার চেক কাটতে গেলে তিনি আমার থেকে দশ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। এবার জমি বিক্রির জন্য নতুন খাজনার চেক দরকার পড়লে গত মঙ্গলবার তহশিলদার লিটন দেওয়ানের কাছে গেলে তিনি নানা তালবাহানা করে ২০ হাজার টাকা নিয়ে দশ টাকার খাজনার চেক ধরিয়ে দেন। আমি যখন বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করি, তিনি তার অফিসে ডেকে নিয়ে লোকজন দিয়ে জোরপূর্বক সাক্ষাৎকার নেন। আমি স্থানীয়দের জানালে তারা প্রতিবাদ জানিয়ে তাকে আমার ২০ হাজার টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করে। তিনি আমাকে মামলার ভয় দেখাইছেন, সেনাবাহিনীর ভয় দেখাইছেন।’
তবে এমন অভিযোগ শুধু আজিজুল হকের নয়। একইভাবে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন আরও এক ভুক্তভোগী। ঘুষ বাণিজ্যের এমন ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মোখলেস কাজী নামের আরও এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমি একটি জমির পিটিশন মামলা করে ডিগ্রি পাই। তখন আমি সেই জমির মিউটেশন করতে গেলে তহশিলদার লিটন দেওয়ান ৪৫ হাজার টাকা নেন। পরে জানতে পারি মিউটেশন করতে সরকারি খরচ আরও অনেক কম লাগে।’
কাওসার আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে জানতে পারি জয়নগর ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা লিটন দেওয়ান এক ব্যক্তির কাছ থেকে দশ টাকার খাজনা বাবদ বিকাশের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। ভুক্তভোগী তার প্রতিবাদ জানালে তাকে মামলার ভয় দেখানো হয়। একজন সাধারণ মানুষ যেখানে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়, সেখানে এ ধরনের কর্মকর্তার অপসারণ জরুরি।’
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তহশিলদার লিটন দেওয়ানের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি। বরং ক্যামেরা দেখে দ্রুত কক্ষ ছেড়ে চলে যান।
অপরদিকে ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। তদন্ত কমিটির মাধ্যমে দোষী প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
এ বিষয়ে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, আমরা এরই মধ্যে ভিডিওটি দেখেছি। ঘটনাটি তদন্তে জাজিরা উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।