উত্তর ইউরোপের দেশ লিথুয়ানিয়ায় নেওয়ার স্বপ্ন দেখান সাহাব উদ্দিন। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে বিভোর ছয় যুবকের কাছ থেকে এজন্য তিনি ৩০ লাখ টাকা নেন। বাংলাদেশে লিথুয়ানিয়ার দূতাবাস না থাকায় তাদের প্রথমে উড়াল দিতে হয় নেপাল। সেখানে বাকি প্রক্রিয়া কাগজ-কলমে দেখানো হয়। কিন্তু সপ্তাহখানেক নেপালে থেকে ছয়জনই ফিরে আসেন বাংলাদেশে।
সাহাব উদ্দিনের জালে দুদফা নেপালে গিয়েও ইউরোপের স্বপ্নপূরণ হয়নি যুবকদের। এমনকি টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিলেও, দিনের পর দিন টালবাহানা করছেন। পরে ভুক্তভোগীদের অন্যতম নোয়াখালীর চাটখিলের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম শুভ গত ২৩ জুন রাজধানীর পল্টন থানায় সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
বাকি ভুক্তভোগী হলেন, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের আমির হোসেন, বসুরহাটের ফয়েজ আহমেদ, কুমিল্লার হোমনার নুর মোহাম্মদ ইয়াসিন, লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের আবুল ফারহান ও রাজধানীর মতিঝিলের বাসিন্দা ফইজ আহমেদ।
এদের মধ্যে চারজনের সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম। প্রত্যেকে জানিয়েছেন, সাহাব উদ্দিনের প্রতারণায় তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় আড়াই বছর। বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও টাকা ফেরত দিচ্ছেন না তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে ‘এসকে ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের’ কর্ণধার সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমার কাছে কারও কোনো পাওনা নেই। আমি যাদের নেপাল পাঠিয়েছিলাম লিথুয়ানিয়ার জন্য, সেই প্রক্রিয়া কাজ করেনি। পরে প্রায় সবার টাকা-পয়সা ফেরত দিয়েছি। শুধু শুভ নামে একজন কিছু টাকা পাবেন, যিনি অন্যের মাধ্যমে এসেছিলেন। আমি তাঁর যতটুকু পাওনা আছে, সব দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
তবে নজরুল ইসলাম শুভ স্ট্রিমকে বলেছেন, ‘ইউরোপে যাওয়ার জন্য আমি সাহাব উদ্দিনকে ৫ লাখ টাকা দিয়েছি। এর মধ্যে তিনি মাত্র ২০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন। চাইলেই আজ না, আগামী সপ্তাহে দেব। এভাবে এক বছর ধরে ঘুরাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে প্রতিকার পেতে থানার দ্বারস্থ হয়েছি।’
এ ব্যাপারে তদন্ত কর্মকর্তা ও পল্টন থানার এসআই আবু সালেহ স্ট্রিমকে বলেন, ‘অভিযোগ নিয়ে কাজ চলছে। আমরা বিবাদীপক্ষকে এখনো রিচ করতে পারিনি। ফোন করলে দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত আসেননি। একসঙ্গে বসলে হয়তো সমাধানের কোনো পথ বের হবে।’
লিথুয়ানিয়ার নামে নেপাল, হোটেলে ফিঙ্গার
ভুক্তভোগীরা জানান, লিথুয়ানিয়া নেওয়ার জন্য তাদের প্রথমে নেপাল যেতে হয়। সেখানে তিন দিন রাখা হলেও, কখনো লিথুয়ানিয়া দূতাবাসে নেননি। নেপালে থাকার শেষ দিনে যে হোটেলে উঠেছিলেন, সেখানে ফিঙ্গার ও স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর জানানো হয়, প্রত্যেকের ই-মেইলে একটি বার্তা যাবে। সেটিই ভিসা বিবেচিত হবে।
শুভ জানান, লিথুয়ানিয়ার জন্য প্রথমে তাঁকে নেপালের টিকিট কাটতে হয়। সঙ্গে ছিলেন পাঁচজন। নেপালে পৌঁছানোর দুদিন পর দূতাবাসে ফিঙ্গার দিতে হবে জানানো হয়। পরে বলা হলো– হোটেল কন্টাক্ট করে ফিঙ্গার নেবেন। ১১টা-১২টার দিকে দূতাবাসের লোক পরিচয়ে দুজন হোটেলে এসে পাঁচজনের নাম, ফিঙ্গার ও স্বাক্ষর নেন। তারাই জানান, ই-মেইলে মেসেজ যাবে। এরপর আবার নেপালে আসতে হবে।
শুভ বলেন, ‘আমার ফার্মেসির ব্যবসা ছিল। ব্যবসার অর্থ, বড় মামা ও ভাইয়ের কাছ থেকে ঋণ করে ৫ লাখ টাকা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাহাব উদ্দিনকে দিয়েছি। তাঁর প্রতারণায় আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। জীবনের আড়াইটা বছর নষ্ট হয়ে গেছে।’
অবশ্য সাহাব উদ্দিন দুষছেন অন্যজনকে। তিনি বলেন, ‘আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তো লাভ নাই। আমার তো লোকসান হয়ে গেছে। আমি যাকে কাজ দিয়েছি, ফিঙ্গার থেকে সব তিনিই করেছেন। আমি তো করি নাই। এখন সব টাকা আমি পরিশোধ করছি।’ কাকে কাজ দিয়েছেন– প্রশ্নে তাঁর নাম না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি লম্বা ইতিহাস। তাঁর ডিটেইলস তো দেশে নাই। আপনার নম্বর আমি রাখলাম। পরে দেওয়ার চেষ্টা করব।’ ওই ব্যক্তির নাম জানতে এরপর একাধিক দিন কল দিলেও রিসিভ করেননি সাহাব উদ্দিন।
যেভাবে জাল বিছান সাহাব উদ্দিন
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীর নয়াপল্টনের এসকে ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের কর্ণধার সাহাব উদ্দিনের সঙ্গে পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করেন ছয় যুবক। তাদের নির্মাণকাজের ভিসায় উত্তর ইউরোপের বাল্টিক অঞ্চলের লিথুয়ানিয়ায় পাঠানোর স্বপ্ন দেখান সাহাব উদ্দিন। এরপর ভিটে বেচে, ঋণ করে কয়েক ধাপে প্রত্যেকে ৫ লাখ টাকা করে তুলে দেন সাহাবের হাতে।
ভুক্তভোগীরা জানান, বাংলাদেশে লিথুয়ানিয়ার কোনো দূতাবাস নেই। এটিকে কারণ দেখিয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে সাহাব উদ্দিন নেপালে দেশটির দূতাবাসে সাক্ষাৎকারের জন্য পাঠান। যে সাক্ষাৎকার দূতাবাসে হওয়ার কথা, সেটি হয় নেপালের একটি হোটেলে। এই নিয়ে সন্দেহ হলে, তাঁরা সাহাবকে জানান। কিন্তু তিনি এই সাক্ষাৎকারকে ভিআইপি বললে সবাই বিশ্বাস করেন। কিন্তু নেপাল থেকে ফেরার মাত্র সাত মাসে বুঝতে পারেন সবাই ঠকে গেছেন। তখন সাহাব উদ্দিন জানান– তাদের ভিসা বাতিল হয়ে গেছে এবং টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকে টাকা ফেরত দেননি সাহাব উদ্দিন।
আমির হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার বাবা জমি বিক্রি করে ৫ লাখ টাকা দেন। সঙ্গে আমি ১০ হাজার টাকা যুক্ত করে সাহাব উদ্দিনকে দিয়েছি। ভিসা বাতিলের খবর জানিয়ে ব্যাংকের হিসাব নম্বর নিয়ে তিনি টাকা ফেরত দেবেন বলেছিলেন। এরপর কল দিলে ধরেন না। দেখা করলে অমুক দিন দেবেন, নানা অজুহাত দিয়ে আসছেন। আমার বাবা এখন অসুস্থ, চোখে দেখে না। এই টাকা হারিয়ে আমরা খুব বিপদে রয়েছি।’
নুর মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ধাপে ধাপে ৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। টাকা পরিশোধের পর বলেন– আমার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। আশ্বাস দিলেও, এখন পর্যন্ত সাহাব উদ্দিন একটি টাকা দেননি।’ আবুল ফারহান বলেন, ‘এতগুলো টাকা দিয়েছিলাম লিথুয়ানিয়া যেতে। কিন্তু নেপাল পর্যন্ত গিয়ে সব শেষ হয়ে গেছে। আমি প্রতারক সাহাব উদ্দিনের বিচার চাই।’
ভুয়া মেসেজে আবার নেপাল গিয়ে ধরা
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রথমবার নেপাল সফরে ফিঙ্গার, স্বাক্ষর নিয়ে তাদের বলা হয়েছিল– সপ্তাহখানেক পরে ইমেইলে মেসেজ পাঠানো হবে। কিন্তু সেই ই-মেইল আসে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। প্রথমবার নেপাল সফরের সাত মাস পর জিমেইলের যে লিংক দেওয়া হয়েছিল, তাতে প্রবেশ করা যায়নি।
নুর মোহাম্মদ ইয়াসিনের ভাষ্যে, নেপাল থেকে আসার পর সাত দিনের অপেক্ষা শেষ হয় সাত মাস পরে। এরপর জিমেইলে একটি মেসেজ আসে। সেটির লিংকে প্রবেশ করা যায়নি।
ভুক্তভোগীরা জানান, লিংকে প্রবেশ করতে না পারলেও, মেসেজ আসার দিনই সাহাব উদ্দিন তাদের ফোন করেন। সবাইকে অফিসে ডেকে ভিসা হয়ে গেছে জানান। এ সময় ভিসা আনার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে শেষ ধাপের টাকা নেন তিনি। ভিসা আনার জন্য সাহাব উদ্দিন তাঁর অফিসের কর্মী মো. আসলামের সঙ্গে ভুক্তভোগী শুভকে নেপাল যেতে প্রস্তাব দেন।
সাহাব উদ্দিনের কথামতো আসলামকে সঙ্গে নিয়ে শুভ আবার নেপাল যান। কথা ছিল সপ্তাহখানেকের মধ্যে ভিসা নিয়ে ফিরবেন। কিন্তু ৫৭ দিনেও ভিসা হাতে পাননি শুভ। উল্টো শুভকে নিজের খরচে নেপাল থেকে দেশে আসতে হয়।
আমার কাছে কারও কোনো পাওনা নেই। আমি যাদের নেপাল পাঠিয়েছিলাম লিথুনিয়ার জন্য, সেই প্রক্রিয়া কাজ করেনি। পরে প্রায় সবার টাকা-পয়সা ফেরত দিয়েছি। শুধু শুভ নামে একজন কিছু টাকা পাবেন, যিনি অন্যের মাধ্যমে এসেছিলেন। আমি তাঁর যতটুকু পাওনা আছে, সব দেওয়ার চেষ্টা করছি।সাহাব উদ্দিন, এসকে ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের কর্ণধার
স্ট্রিমকে শুভ বলছিলেন, ‘সাত দিনের কথা বলে আমাকে নেপালে ৫৭ দিন রাখল। সে সময় ছিল ডিসেম্বরের শেষ দিকে। সাহাব উদ্দিন বললেন– ইউরোপে ক্রিসমাসের ছুটি চলছে, তাই দেরি হচ্ছে। এর মধ্যে ফ্রান্স, বেলজিয়াম থেকে কিছু দালাল নিয়ে আসেন। তারা বললেন, তোমরা ভিসা পাবে, আশা হারিও না।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেষে আমাকে একটি কাগজে সই করাল, যেটি ছিল আমার পরিবর্তে অন্য কারও ভিসা রিসিভের। এরপর দেশে ফিরে আমিসহ ছয়জনই জানতে পারি– ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। আমরা আর লিথুনিয়া যেতে পারব না।’
নুর মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, ‘মেসেজ আসার পর সাহাব উদ্দিন ফোন করে আমাকে অফিসে ডাকেন। আমাদের ভিসা কনফার্ম হয়েছে। এ সময় আমাদের সঙ্গে থাকা শুভ এবং তাঁর এক কর্মীকে ভিসা আনতে নেপাল পাঠান সাহাব উদ্দিন।’