Image description

শতকোটি টাকার পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে যুবক আল মুক্কাবির ইসলাম অর্ণব খুন হয়েছেন, নাকি তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে আত্মহননের পথে? রাজধানীর ধানমন্ডিতে একটি ১১ তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে অর্ণবের মৃত্যুর আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো খোলেনি এই রহস্যের জট। 

প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হলেও নিহতের মায়ের দায়ের করা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মামলা এবং ঘটনার দুদিন আগে অর্ণবের করা মাদক পরীক্ষার রিপোর্ট নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

গত ২ মে দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডি ১১ নম্বর সড়কের একটি ১১ তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে অর্ণবের (৩৪) রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ভবনটির লিফটের মেশিন কক্ষের ওপর থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানায়। প্রাথমিকভাবে ধানমন্ডি থানায় এটি অপমৃত্যু মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় এবং এজাহারে অর্ণব দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে গত ২১ মে অর্ণবের মা হালিমা খাতুন ৩ চাচা-ফুফুসহ ১২ জনকে আসামি করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যার মধ্য দিয়ে ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করা হয়। 

 

বাবার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পদ

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক রফিকুল ইসলামের রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে, রাজধানীর ধানমন্ডির ৮/এ নম্বর রোডে একটি ফ্ল্যাট, ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট, সেগুনবাগিচায় কয়েক কোটি টাকা মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট, উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট এবং মালিবাগের মীরবাগে ৫ তলা বাড়ি। এছাড়া ডেমরায় রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কিশোরগঞ্জের আকবপুরে ১০ একর জমির ওপর উমেদ আলী ভুঁঞা উচ্চবিদ্যালয় এবং নীলগঞ্জে আড়াই একর জায়গার ওপর রফিকুল ইসলাম কলেজ রয়েছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে কিশোরগঞ্জের খালিয়াজুড়িতে প্রায় একশ একর কৃষিজমি ও খামারবাড়ি, তাড়াইল উপজেলায় ২০ একর জমি, দোতলা বাড়ি এবং কিশোরগঞ্জ শহরে ১০ শতাংশ জমি রয়েছে।

২০১৬ সালে বয়স জালিয়াতির অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় কারাবরণ করেছিলেন রফিকুল ইসলাম। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৭ সালে হৃদরোগে আকস্মিক মৃত্যু হয় তার। এরপর থেকেই তার এই বিপুল সম্পত্তি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে এবং এর দেখভাল নিয়ে পরিবারে তীব্র জটিলতা ও দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়।

সম্পত্তি ঘিরে পারিবারিক দ্বন্দ্ব

রফিকুল ইসলামের জীবদ্দশায় তার বিপুল সম্পদের একটি বড় অংশ দেখভাল করতেন তার ছোট ভাই ওসমান গনি, যিনি এক সময় পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ছিলেন। তবে বাবার মৃত্যুর পর অর্ণব যখন পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগ নেন, তখন চাচা ওসমান গনি, জাহেদ ও হারুনসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এমনকি অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রিতেও নানাভাবে বাধা দেওয়া হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানান। এই সম্পত্তিগত বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক অস্থিরতা ও ক্ষোভের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন অর্ণব।

পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে মনে হলেও একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক তরুণ কোনো পূর্ব আভাস না দিয়ে হঠাৎ কেন আত্মহননের পথ বেছে নেবেন? তাদের সন্দেহ, বাবার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তির লোভেই অর্ণবকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষা হতে পারে, অথবা কৌশলে তার জীবনকে এমন মানসিকভাবে দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছিল, যাতে তিনি নিজেই নিজের জীবন শেষ করার মতো চরম কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

অর্ণবের মামা মোতাহার হোসেনের সঙ্গে কথা হলে এই ঘটনার পেছনের এক দীর্ঘ ও জটিল পারিবারিক চিত্র উঠে আসে। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, রফিকুল ইসলাম ও হালিমা খাতুনের সংসারে প্রথম সন্তান পূর্ণার জন্মের পর থেকেই রফিকুলের ভাইবোন—ওসমান, জাহেদ ও ঝর্না পরস্পর যোগসাজশে হালিমাকে পরিবারে কোণঠাসা করার চেষ্টা শুরু করেন। 

মোতাহারের দাবি, পূর্ণাকে মাত্র দুই বছর বয়সে কিশোরগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দেড় মাস আটকে রাখা হয়েছিল। রফিকুল তার ভাইবোনদের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করলেও হালিমাকে তার ব্যাংকের চাকরি ছাড়তে চাপ দেওয়া হতো। অর্ণবের জন্মের পর তিনি রফিকুলের সম্পত্তির স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠায় আসামিদের মধ্যে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় এবং তখন থেকেই অর্ণবের প্রতি তাদের অসন্তোষের সূত্রপাত হয়।

এই পারিবারিক টানাপোড়েনের জেরে ২০০৭ সালে হালিমা ও রফিকুলের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীতে হালিমা দ্বিতীয় বিয়ে করলে সন্তানদের হেফাজত রফিকুলের কাছে চলে যায়। পরে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর হালিমা দীর্ঘদিন সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য হন, যদিও পরে সন্তানদের ফিরে পেতে তিনি পারিবারিক আদালতে মামলা করেছিলেন। 

মোতাহারের অভিযোগ, এই সময়ে জাহেদ, ওসমান, ঝর্না ও বাসার কর্মচারীদের যোগসাজশে রফিকুল ও তার সন্তানদের ওপর তীব্র মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, যার ফলে রফিকুল অসুস্থ হয়ে একপর্যায়ে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর অর্ণব ও তার দুই বোনকে কার্যত অসহায় অবস্থায় ফেলে রফিকুলের সম্পত্তি চাচারা নিজেদের দখলে নেন এবং জমির ফসলের আয়ও বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে অর্ণব নিজের পৈতৃক সম্পত্তি বুঝে নিতে চাইলে তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি ও অপমান করা হতো।

মোতাহার হোসেন আরও দাবি করেন, অর্ণবকে তার চাচা ওসমানের ছোট মেয়েকে বিয়ে করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল, যা অর্ণব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে ওসমান ও তার স্ত্রী অর্ণবের বাসায় আসেন। তাদের কথোপকথনে কোনো অশুভ মতলব আঁচ করতে পেরে অর্ণব নিরাপত্তার শঙ্কায় বাসা থেকে বেরিয়ে খালার বাসায় আশ্রয় নেন। সেখানে রাত কাটিয়ে পরদিন তিনি তার মায়ের বাসায় যান এবং রাত দশটা পর্যন্ত অবস্থান করে পুরো ঘটনা মাকে বিস্তারিত জানান। 

মোতাহারের দাবি, বাসার গৃহকর্মীদের মাধ্যমে অর্ণবকে খাবারের সঙ্গে কোনো না কোনো মাদক বা চেতনাধনাশক ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে, এমন সন্দেহ থেকে মৃত্যুর দুদিন আগে (৩০ এপ্রিল) তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ল্যাবে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়েছিলেন।

জানা গেছে, ধানমন্ডির ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ইমেজিং সেন্টারে করা পরীক্ষার সেই রিপোর্টে ক্যানাবিনয়েডস, ওপিয়েটস, বেনজোডায়াজেপিন, কোকেইন ও অ্যাম্ফিটামিন, এই পাঁচটি প্যারামিটারের প্রতিটির ফলাফলই নেগেটিভ আসে। অর্থাৎ, এই ল্যাব টেস্টে নির্দিষ্ট ওই পাঁচ ধরনের কোনো মাদক বা সন্দেহজনক ওষুধের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলা, তিন চাচা-ফুফুসহ আসামি ১২ জন

অর্ণবের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তার মা হালিমা খাতুনের দায়ের করা মামলায় মোট ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় রয়েছেন অর্ণবের চাচা ওসমান গণি ভূঁঞা (৬৮) ও তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়া (৭০), আরেক চাচা জাহেদ ভূঁঞা (৭২) ও তার স্ত্রী সেনুয়ারা বেগম রেনু (৬২)। এছাড়া জাহেদ ভূঁঞার দুই ছেলে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মৃদুল ভূঁঞা (৩৪) ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিসা সেলে কর্মরত ডেটা এন্ট্রি অপারেটর দুলদুল ভূঁঞা (৩২)। মামলার অন্য আসামিরা হলেন, আরেক চাচা হারুন অর রশিদ ভূঁঞা (৫৮), রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ও অর্ণবের ফুফু ঝর্না লুৎফা (৫৬) এবং তার দুই ছেলে ছাদি (২৬) ও মাহি (২২)। পাশাপাশি অর্ণবের বাসায় কর্মরত দুই গৃহকর্মী জেষ্টিনা ম্রং ও তানজিলা বেগমকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর থেকেই তার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র দ্বন্দ্ব চলছিল। 

বাদীর অভিযোগ, আসামিরা যৌথভাবে এই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি ভোগদখল, বিক্রি বা হস্তান্তরে বারবার বাধা দিয়ে আসছিলেন। এমনকি অর্ণবের স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও নানাভাবে সীমিত করে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকেই আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অর্ণবকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।

এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের মাধ্যমে অর্ণবকে ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এই ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রেরই একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়। সুপরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে এবং আইনি জবাবদিহি থেকে রেহাই পেতে পরবর্তীতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যার নাটক হিসেবে সাজানো হয়েছিল, যাতে প্রকৃত সত্য কখনো সামনে না আসে।

মামলার প্রধান আসামি ও নিহতের চাচা ওসমান গণি এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, যেহেতু ঘটনাটি নিয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে এবং পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। 

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, অর্ণবের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তার মা আদালতে সুনির্দিষ্ট হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি এজাহার (এফআইআর) হিসেবে গ্রহণ করার জন্য থানাকে নির্দেশ দিলে তদন্তের দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত হয়। 

তিনি বলেন, মামলার প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।