Image description

মোবাইল অপারেটরগুলোর সেবার মান নিশ্চিত করা, গ্রাহকস্বার্থ রক্ষা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কয়েক বছর আগে টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) চালুর উদ্যোগ নেয়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কল ড্রপ, ইন্টারনেটের গতি, ভয়েস ও ডেটা ট্রাফিক, বিভিন্ন ট্যারিফ প্যাকেজ এবং রাজস্ব-সংক্রান্ত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা ছিল। কিন্তু কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এই সিস্টেম দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। 

 

২০২১ সালের ২ আগস্ট মোবাইল অপারেটরদের কার্যক্রম তদারকির জন্য প্রায় ৭৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টিকেসি টেলিকমের সঙ্গে টিএমএস সরবরাহের চুক্তি করে সরকার। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করা এবং বাস্তব সময়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা।

 

 

বিটিআরসি সে সময় জানিয়েছিল, এই সিস্টেম চালু হলে ভয়েস ও ডেটা ট্রাফিক, নেটওয়ার্ক ব্যবহার, সেবার মান এবং কমিশনের প্রাপ্য রাজস্ব-সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরো দ্রুত ও কার্যকর হবে। শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল, দ্বীপ, হাওর, উপকূল ও দুর্গম অঞ্চলের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের প্রকৃত অবস্থাও তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

এছাড়া অপারেটরদের বিভিন্ন ট্যারিফ প্যাকেজ বিটিআরসির অনুমোদিত কি না, গ্রাহকরা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কি না, তা-ও যাচাই করার কথা ছিল। গ্রাহকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও টিএমএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এসব সুবিধার অধিকাংশই কার্যকর হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

 

যে সুবিধাগুলো দেওয়ার কথা ছিল

মোবাইল অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কল ড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট এবং ট্যারিফ প্যাকেজ বাস্তবায়নে অসঙ্গতির অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। উদাহরণ হিসেবে, অনেক প্যাকেজ ৩০ দিনের নামে বিক্রি হলেও কার্যকারিতা ২৯ দিনে সীমাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

এসব বিষয় প্রযুক্তিনির্ভরভাবে যাচাই করার জন্যই টিএমএস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এই সিস্টেমের মাধ্যমে ভয়েস কল, এসএমএস, ডেটা ব্যবহার, ইন্টারনেটের গতি এবং নেটওয়ার্কের কর্মক্ষমতা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের কথা ছিল। একই সঙ্গে অপারেটরদের বাস্তবায়িত ট্যারিফ অনুমোদিত কি না, গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কি না এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিও নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল।

এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারণ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও এই সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানানো হয়েছিল।

কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন হয়নি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ ও তা বিশ্লেষণ করে সব তথ্য শতভাগ সরবরাহ করার কথা থাকলেও টিএমএস প্রযুক্তিতে ত্রুটি থাকায় বিটিআরসির টিএমএস কোনো কাজে আসেনি।

 

রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিয়ে নতুন উদ্যোগ

বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য পরিচালন ব্যয় বাবদ ছয় লাখ এবং রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ চার লাখ মার্কিন ডলার দাবি করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে টিএমএস বাস্তবে সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১০ জুন একটি কমিটি গঠন করে বিটিআরসি। সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের মতামত নিয়ে অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কমিটিকে টিএমএসের কারিগরি কার্যকারিতা, ব্যবহারিক উপযোগিতা এবং চুক্তির শর্ত পূরণের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। পরে ১৬ জুন বিটিআরসি এক অফিস আদেশে কানাডার টিকেসি টেলিকমের সেবা এবং অর্থ পরিশোধ-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিবেদন চেয়ারম্যানের কাছে দাখিলের নির্দেশ দেয়।

 

কাজে আসছে না টিএমএস

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মোবাইল অপারেটরদের ইনকামিং-আউটগোয়িং কল, ভয়েস ও ডেটা ট্রাফিক, ইন্টারনেটের মান এবং রাজস্ব-সংক্রান্ত তথ্য সরাসরি পর্যবেক্ষণের জন্য টিএমএস চালুর কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সক্ষমতা কার্যকর হয়নি।

প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মোবাইল অপারেটরদের ভয়েস ও ডাটা ট্রাফিক, নেটওয়ার্ক ব্যবহার এবং প্রকৃত সেবার মান বিটিআরসি সরাসরি লাইভ ট্র্যাক করতে পারবে। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। ফলে প্রায় ৭৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটি সচল করার নামে বিটিআরসি নতুন করে সরকারি অর্থ বরাদ্দ চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বর্তমান সরকার প্রকল্পটি নিয়ে বড় নাখোশ বলে জানা গেছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে বিটিআরসির উপপরিচালক (জনসংযোগ) আব্দুস শহীদ চৌধুরীর কাছে আমার দেশ-এর পক্ষ থেকে লিখিত পাঁচটি প্রশ্ন পাঠানো হয়। তবে প্রশ্ন পাঠানোর দুই সপ্তাহ পরও সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।