Image description

বিশ্বাসের জায়গা থেকেই মানুষ বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মী কিংবা পরিচিত কাউকে টাকা ধার দেন। কিন্তু সেই বিশ্বাসই অনেক সময় বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধার নেওয়ার সময় দ্রুত টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরে নানা অজুহাত, সময়ক্ষেপণ কিংবা যোগাযোগ এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ফলে সম্পর্কও নষ্ট হয়, আবার কষ্টার্জিত টাকাও ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

আইনজীবী ও আর্থিক পরামর্শকদের মতে, ধারের টাকা ফেরত আদায়ে শুরুতেই আইনি লড়াইয়ে না গিয়ে ধাপে ধাপে এগোনোই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা, এরপর লিখিত প্রমাণ সংগ্রহ এবং সবশেষে প্রয়োজন হলে আইনের আশ্রয় নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রথম ধাপ: শান্তভাবে যোগাযোগ করুন

অনেক সময় মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, ব্যস্ততা বা আর্থিক সংকটের কারণেও টাকা ফেরত দিতে দেরি করে। তাই শুরুতেই উত্তেজিত না হয়ে ভদ্রভাবে যোগাযোগ করা উচিত।

ফোন, বার্তা বা সামনাসামনি আলাপের মাধ্যমে তাকে টাকার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। সরাসরি চাপ সৃষ্টি না করে নিজের প্রয়োজনের কথাও জানানো যেতে পারে। এতে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি সহজ হয়।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম কথোপকথনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমাধান খোঁজা, সম্পর্ক নষ্ট করা নয়।

নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করুন

বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার পরও যদি টাকা না পাওয়া যায়, তাহলে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত।

কবে টাকা পরিশোধ করা হবে, সেটি দুই পক্ষের সম্মতিতে লিখিত বা বার্তার মাধ্যমে নির্ধারণ করলে পরে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমে যায়।

একসঙ্গে না পারলে কিস্তিতে ফেরতের সুযোগ দিন

অনেক সময় ঋণগ্রহীতার পক্ষে এককালীন পুরো টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে মাসিক বা সাপ্তাহিক কিস্তিতে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে ঋণগ্রহীতার ওপর চাপ কমে, আবার পাওনাদারও ধীরে ধীরে নিজের অর্থ ফেরত পান।

প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিন

ঋণগ্রহীতা যদি আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হন, তাহলে পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য, সম্মানিত ব্যক্তি বা উভয়ের পরিচিত কাউকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। অনেক সময় নিরপেক্ষ একজন মানুষের উপস্থিতিতে দ্রুত সমাধান হয়ে যায়।

প্রমাণ সংগ্রহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধারের টাকা উদ্ধারে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রমাণ। যদি আগে কোনও লিখিত চুক্তি না থাকে, তাহলে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, এসএমএস, ই-মেইল বা অডিও বার্তায় ঋণগ্রহীতার টাকা নেওয়ার স্বীকারোক্তি সংরক্ষণ করা উচিত।

ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হলে সেই লেনদেনের কাগজপত্রও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

লিখিত চুক্তি থাকলে ঝুঁকি কমে

বড় অঙ্কের টাকা ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি করা সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবস্থা। চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে পারে– কত টাকা ধার দেওয়া হয়েছে; কবে ফেরত দিতে হবে; কীভাবে পরিশোধ করা হবে; সময়মতো পরিশোধ না করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া টাকা গ্রহণের রসিদ এবং ঋণগ্রহীতার স্বাক্ষর ভবিষ্যতে আইনি সুরক্ষা দেয়।

সিকিউরিটি চেক রাখতে পারেন

আইনজীবীরা পরামর্শ দেন, বড় অঙ্কের টাকা ধার দেওয়ার সময় সমপরিমাণ অর্থের একটি পোস্ট-ডেটেড বা নিরাপত্তা (সিকিউরিটি) চেক নেওয়া যেতে পারে।

ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত না দিলে সেই চেক ব্যাংকে উপস্থাপন করা যায়। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় চেক প্রত্যাখ্যাত হলে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস আইনের আওতায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে।

লিগ্যাল নোটিশ অনেক সময় কার্যকর

সব ধরনের আলোচনার পরও যদি টাকা ফেরত না পাওয়া যায়, তাহলে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো যেতে পারে।

নোটিশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রেই আদালতে যাওয়ার আগেই এ ধরনের নোটিশের পর দেনাদার টাকা পরিশোধ করেন।

সবশেষ উপায় দেওয়ানি মামলা

লিগ্যাল নোটিশেও কাজ না হলে পাওনাদার অর্থ আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে ‘মানি স্যুট’ করতে পারেন। চুক্তিপত্র, ব্যাংক লেনদেন, রসিদ, বার্তা বা অন্যান্য প্রমাণ থাকলে আদালতে দাবি প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলক সহজ হয়।

প্রতারণা হলে ফৌজদারি মামলাও হতে পারে

যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্যে টাকা নেওয়া হয়েছিল, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ফৌজদারি মামলার সুযোগও থাকতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ধার দেওয়ার আগেই যেসব সতর্কতা জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকা উদ্ধারের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ধার দেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে– শুধু বিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করা; সম্ভব হলে লিখিত চুক্তি করা; নগদের বদলে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দেওয়া; টাকা গ্রহণের রসিদ রাখা; বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা চেক নেওয়া; পরিশোধের সময়সীমা আগেই নির্ধারণ করা।

সম্পর্কও বাঁচুক, টাকাও ফিরুক

ধারের টাকা নিয়ে বিরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক। তাই শুরুতেই ধৈর্য, সৌজন্য ও আলোচনার পথ বেছে নেওয়া উচিত। তবে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করেন বা টাকা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেন, তাহলে নিজের অধিকার রক্ষায় আইনের আশ্রয় নিতে দ্বিধা করার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বিশ্বাসের সঙ্গে প্রমাণও জরুরি। কারণ লিখিত নথি ও সঠিক প্রক্রিয়া থাকলে পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।