এক বছর আগেও বিদেশে চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার মার্কিন ডলারের (১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা) বেশি পাঠাতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হতো। সাধারণ মানুষের জন্য সে অনুমোদন পাওয়া বেশ কঠিনই ছিল। ফলে অনেকেই অনুমোদনের ঝামেলা এড়িয়ে দেশ থেকে হুন্ডি বা অন্য অনানুষ্ঠানিক পথে বিদেশি অর্থ নিয়ে চিকিৎসার খরচ মেটাতেন।
তবে বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য ডলার পাঠানোর সীমা বাড়ানোর পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে চিকিৎসা ব্যয় পাঠানোর পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বৈধ পথে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছিল মাত্র ৩৪ লাখ ডলার। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে। অর্থাৎ চার বছরে বৈধ পথে বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ পাঠানো প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্লাস–মাইনাস ফাইভ বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে বিদেশে চিকিৎসার জন্য। আমাদের দেশের বহু মানুষ—লক্ষ লক্ষ মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে। তার ফলে আমাদের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রাও সেই সাথে চলে যাচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো হুন্ডি বা অন্য অনানুষ্ঠানিক পথেই দেশের বাইরে যাচ্ছে।

বৈদেশিক বাণিজ্যে সক্রিয় ব্যাংকগুলোর অন্যতম শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসার জন্য ডলার পাঠানোর সীমা বাড়ানো ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এর চেয়ে বেশি অর্থের প্রয়োজন হলে গ্রাহকেরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতির জন্য আবেদন করতে চান না, নিজেরাই বিকল্প ব্যবস্থা করেন। তাঁর মতে, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বিবেচনায় বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের অনুমোদনের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে দিলে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো আরও বাড়ত। এতে হুন্ডি কমে প্রবাসী আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত। সব ধরনের রোগের জন্য না হলেও দুরারোগ্য রোগের ক্ষেত্রে এ ধরনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
যে সুবিধা মিলেছে
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতের ভিসা পেতে নানা ধরনের ভিসা জটিলতা তৈরি হয়। লম্বা সময় ভিসা দেওয়া বন্ধ রেখেছিল প্রতিবেশী দেশটি। ফলে বিদেশে উন্নত চিকিৎসাপ্রত্যাশীদের অনেকেই ভারতের পরিবর্তে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে যেতে শুরু করেন। এসব দেশে চিকিৎসা ব্যয় ভারতের চেয়ে অনেক বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে মার্কিন ডলারের দাম। ফলে রোগীদের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের মে মাসে বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য ডলার পাঠানোর সীমা বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ–সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি ছাড়াই ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ছাড় করতে পারবে। এর বেশি প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে। এর আগে এ সীমা ছিল ১০ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, হাসপাতালের নামে কিংবা আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করা যাবে। এ সীমার মধ্যে গ্রাহকেরা চাইলে ৫ হাজার ডলার নগদও নিতে পারবেন।
এর ফলে যাঁদের চিকিৎসা ব্যয় ১৫ হাজার ডলারের মধ্যে থাকে, তাঁরা সরাসরি সুবিধাটি পাচ্ছেন। এমন একজন সুবিধাভোগী একটি বেসরকারি কোম্পানির কর্মী তৌহিদুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে জানান, থাইল্যান্ডে তাঁর স্ত্রীর ক্যানসারের চিকিৎসা করাচ্ছেন। বৈধ পথে চিকিৎসা ব্যয়ের সুযোগ বাড়ায় এখন ব্যাংকের কার্ড দিয়েই খরচ করা যাচ্ছে।
আগে রোগীদের বা তাঁদের স্বজনদের হুন্ডির মতো অবৈধ মাধ্যমে অর্থ নিয়ে নগদ বৈদেশিক মুদ্রায় খরচ করতে হতো। এতে বাড়তি ঝুঁকিও ছিল।
বৈধ পথে ব্যয় বেড়েছে
বিদেশে চিকিৎসার জন্য ডলার পাঠানোর সীমা বাড়ানোর পর বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। গত চার বছরে বৈধ পথে চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশ থেকে বৈধ পথে বিদেশে ৩৫ লাখ ডলার নেওয়া হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ১৮ লাখ ডলারে নামে। পরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এক লাফে তা ১ কোটি ডলারে পৌঁছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈধ পথে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র চার বছরে বৈধ পথে পাঠানো অর্থ ৩৪ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।
তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বৈধ পথে পাঠানো ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রকৃত চিত্রের খুবই ছোট একটি অংশ। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশি রোগীরা প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসার জন্য ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন, অর্থাৎ ৪০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করেন। এর বড় অংশই এখনো পর্যটন ভিসায় গিয়ে বা অনানুষ্ঠানিক পথে পাঠিয়ে খরচ করা হয়।