Image description

দুই বছর আগেও ঈদ কিংবা অন্য যেকোনো উৎসব মানেই ছিল হাসি-আনন্দে ভরা একটি পরিবার। সেই পরিবারের প্রাণকেন্দ্রে ছিলেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তার মৃত্যুর পর বদলে গেছে সবকিছু। উৎসবের দিনগুলো এখন শোকের স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে পরিবারটির কাছে। একই সঙ্গে তাদের তাড়া করে ফেরে আরেকটি প্রশ্ন– দুই বছরেও কেন হয়নি হত্যাকাণ্ডের বিচার?

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের মৃত্যুর প্রায় দুই বছর হতে চলেছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই আটকে আছে। এ নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন তার যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। তিনি বলছেন, শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এখনো হয়নি; বিচারহীনতা শুধু শহীদ পরিবারের নয়, শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গেও এক ধরনের ‘বেইমানি’।

সম্প্রতি ঢাকা পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্নিগ্ধ বলেন, যারা একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্নে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের হত্যার বিচার দুই বছরেও শুরু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল হত্যাকাণ্ডগুলোর দ্রুত ও সঠিক বিচার। কিন্তু বিচার কার্যক্রম এখনো প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করতে পারেনি। এতে পরিবারগুলোর হতাশা ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, শুধু বিচার নয়, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল– রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন, একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা– সেই লক্ষ্যেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। দুই বছর পার হলেও বারবার আশ্বাস মিলছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ছিটেফোঁটাও চোখে পড়ছে না। এ পরিস্থিতিকে আমি শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল বলে মনে করছি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর যমজ ভাইয়ের আক্ষেপ– ‘যে বাংলাদেশের জন্য মুগ্ধ প্রাণ দিল, দুই বছর পরও সেই বাংলাদেশ আমরা দেখতে পাইনি; এখনো অপেক্ষা দ্রুত বিচার ও স্বপ্নপূরণের’ | ফাইল ছবি

বিচার বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্নিগ্ধ বলেন, একটি প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে– ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’, অর্থাৎ বিলম্বিত বিচার অনেক সময় বিচার না পাওয়ারই নামান্তর। আমি মনে করছি, দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই আশঙ্কাই ক্রমশ বাড়ছে। পরিবার এখনো নিশ্চিত হতে পারছে না, সময়মতো কাঙ্ক্ষিত বিচার আদৌ পাওয়া যাবে কি না।

উৎসব এখন শোকের দিন

ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্নিগ্ধ। তিনি বলেন, মুগ্ধ ছিল পরিবারের প্রাণ। তার উপস্থিতিতে পরিবারে সব সময় হাসি-আনন্দের পরিবেশ থাকত। কিন্তু মুগ্ধ চলে যাওয়ার পর সেই পরিবেশ আর কখনো ফিরে আসেনি। এখনো প্রতিদিন তাকে মনে পড়ে। বিশেষ করে ঈদ, রোজা কিংবা অন্য যেকোনো উৎসবের দিনে তার অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।

তিনি জানান, তাদের মা এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। প্রতিটি উৎসবের দিনই তার কাছে শোকের দিনে পরিণত হয়েছে। পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সদস্যের স্মৃতি তাকে বারবার কাঁদায়। ফলে যে দিনগুলো একসময় আনন্দের ছিল, সেগুলো এখন তাদের পরিবারের কাছে সবচেয়ে কষ্টের দিন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজপথে উচ্চারিত হয়েছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। দুই বছর পরও সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ও শহীদদের হত্যার বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে শহীদ পরিবারের সদস্যরা | ফাইল ছবি

‘মুগ্ধর ভিডিওই হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার অস্বস্তি’

সাক্ষাৎকারে মুগ্ধ হত্যার পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন স্নিগ্ধ। তিনি বলেন, ‘১৮ জুলাই মুগ্ধ নিহত হওয়ার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। পরে মুগ্ধর নিজের মোবাইল ফোন থেকেই আমরা সেই ভিডিওটি উদ্ধার করি, যেখানে দেখা যায়– সে আন্দোলনকারীদের পানি বিতরণ করছিল।’

১৯ জুলাই দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, ঘটনাটি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর ২৩ বা ২৪ জুলাই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

স্নিগ্ধর দাবি, ভিডিওটি প্রকাশের পর থেকেই তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সে সময় সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ একটি প্রতিনিধিদল তাদের বাসায় আসে। যাদের উদ্দেশ্য ছিল, পরিবারকে সরকারপক্ষের অবস্থান সমর্থন করতে রাজি করানো এবং গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য রাজি করানো।

শহীদ মুগ্ধর পরিবারের দাবি, যে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় মানুষ জীবন দিয়েছিল, তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয় | ফাইল ছবি

তবে পরিবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। স্নিগ্ধ বলেন, আমাদের অবস্থান ছিল স্পষ্ট– যাদের আমরা ভাইয়ের হত্যার জন্য দায়ী মনে করছি, তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই সাক্ষাৎ করতে যাব না। প্রয়োজনে কেউ আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে বাসায় আসতে পারেন, কিন্তু আমরা গণভবনে যাব না।

ব্ল্যাংক চেকও ফিরিয়ে দিয়েছিল পরিবার

স্নিগ্ধ বলেন, গণভবনে যাওয়ার জন্য আমাদের ‘ব্ল্যাংক চেক’ পর্যন্ত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবার সেটিও প্রত্যাখ্যান করে। এরপর বিভিন্ন সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে চাপ এবং হুমকি আসতে থাকে। এমনকি গণভবনে না গেলে আমাদের নিরাপত্তার দায় কেউ নেবে না বলেও সতর্ক করা হয়েছিল।

মুগ্ধর পরিবারের দাবি, ১৮ জুলাই নিহত হওয়ার পর তার মোবাইল ফোনে ধারণ করা আন্দোলনকারীদের পানি বিতরণের ভিডিও প্রকাশের পর তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে পরিবারকে গণভবনে গিয়ে সরকারের অবস্থান সমর্থনের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তবে পরিবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

তিনি আরও বলেন, সে পরিস্থিতিতে আমাদের পরিবার তখন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের ওপর কোনো ধরনের অমানবিক আচরণ করা হলে কিংবা পরিবারের ক্ষতি করার চেষ্টা হলে মুগ্ধ হত্যার আগে-পরে ধারণ করা আরও ভিডিও ও তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।

স্নিগ্ধ আরও জানান, পরে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় ২৮ জুলাই পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদা স্থানে আত্মগোপনে চলে যান। বাবা-মা এক জায়গায়, তিনি অন্য জায়গায় এবং তার বড় ভাই আরেক জায়গায় ছিলেন। ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তারা আবার নিজেদের বাসায় ফিরে আসেন।

বাবার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তিনি জানান, সম্প্রতি বাবা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরে তার হৃদ্‌যন্ত্রে একাধিক রিং বসানো হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।

তবে ভাই হারানোর দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে স্নিগ্ধর প্রত্যাশা একটাই– ‘শহীদদের হত্যার দ্রুত বিচার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন’। তবে তার আক্ষেপ, ‘যে বাংলাদেশের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই বাংলাদেশ এখনো আমরা দেখতে পাইনি।’