‘হামার বাড়ি নদীর কিনোরত। সব খানে বাঁন্দে হামার এদিকে বাঁন্দে না। এই পানি বাড়ে, এই পানি কমে। কখন পানি হামার বাড়িত উঠে। পানি কমলে ভাঙনে ফির হামার বাড়ি কখন যানি চলি যায়। এই বাড়ি ভাঙি গেইলে কই যামো, কই থাকমো।’
কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রতি মৌজার তিস্তা নদী পাড়ের দম্পতি আব্দুল জলিল (৬৫) ও স্ত্রী উম্মে কুলসুম বেগম (৪৫)।
জানা গেছে, উপজেলার বিদ্যানন্দ ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের তিস্তা নদীতে পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে তিস্তা নদী তীরবর্তী বিভিন্ন চরাঞ্চলে। ভাঙনে প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমিন ও বিভিন্ন এলাকা। হুমকির মুখে রয়েছে মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান, বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন চলাকালীন সময়ে জিও ব্যাগ ফেললেও সেগুলো চলে যাচ্ছে নদী গর্ভে। ফলে ঘরবাড়ি নিয়ে ভাঙনকবলিতরা বিভিন্ন মানুষের কাছে মাথা ঠুকলেও প্রশাসন থেকে নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর কোনো পদক্ষেপ।
স্ত্রী উম্মে কুলসুম বেগম বলেন, আমার স্বামীর অনেক জমি ছিল। ২১ বছর আগে নদীর ভাঙনে সব নদীত চলি গেইছে। এই পাড়ে আসি অল্প এহনাত জাগাত বাড়ি আছি। বাড়ি ভিটা ছাড়া আর কিছুই নাই। এই বাড়ি নদীত চলি গেইলে আর উপায় নাই।
আব্দুল জলিল বলেন, ছেলে গার্মেন্টসে চাকরি করে মাসে মাসে যে টেকা পাঠায় সেই টেকা দিয়ে কোনো রকম সংসার চলে। কাজ কামাই করবের পাইনে। ধার দেনা করি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। শুধু আমরায় বাড়িত থাকি সব জায়গায় নদী বান্দিছে আমার বাড়ির সামনে বান্দে নাই। রাতে যখন শুয়ে থাকি ঘুম ধরে না কখন জানি ভাঙি নিয়ে যায় বাড়ি খেন। ঠিকমতো ঘুম হয় না। হামারে বাচাঁন। সরকারি লোক আইসে আর কয় বান্দি দেমো কিন্তু আর বান্দি দেয় না। তাই সরকারের কাছত দাবি বাড়ির সামন খেন যেন বান্দি দেয়।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের আব্দুল জলিল বলেন, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীতে পানি বাড়া-কমার কারণে এই ভাঙন দেখা দিয়েছে। তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, অনেকে ঘরবাড়ি সরানোর সময় পাচ্ছে না। চরে নিরাপত্তা না থাকায় ভাঙন কবলিতরা চর থেকে বাড়িঘর সরিয়ে মেইনল্যান্ডের দিকে ধাবিত হলেও সেখানে থাকার জায়গা পাচ্ছে না।
একই ইউনিয়নের আলম মিয়া বলেন, নদী ভাঙলেও সেরকম কাজ করা হচ্ছে না। সামান্য দুই বস্তা জিও ব্যাগ দিয়েছে, সেগুলোও নদীগর্ভে চলি যাচ্ছে। মসজিদ ও স্কুল ভাঙনের মুখে রয়েছে। কখন জানি চলি যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিম বলেন, আমরা ভাঙন কবলিত এলাকা পরির্দশন করে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া বিভিন্ন দপ্তর থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। ভাঙনে যারা বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্য জায়গায় যাচ্ছে, তাদের মধ্যে যাদের জায়গা নেই তাদের আমরা আবেদন নিচ্ছি। পাশাপাশি ভূমিহীন হিসেবে তাদেরকে খাসজমি বন্দোবস্ত করা যায় কিনা সেই বিষয়টিও আমাদের নজরে রয়েছে।