Image description

খুলনায় গত দেড় বছরে পুলিশের তালিকাভুক্ত ১৫ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে তিনটি থেকে ১৪টি পর্যন্ত মামলা আছে। তারা সবাই এরই মধ্যে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। কয়েকজন মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়েছেন। কারণ নতুন হত্যা, চাঁদাবাজি ঘটনায় তাদের নাম এসেছে। ফলে মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীদের পরিবারে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ১৫ সন্ত্রাসীর মধ্যে সাতজন উচ্চ আদালত এবং বাকিরা বিচারিক আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। পুলিশের তালিকার বাইরে জামিনে মুক্তি পাওয়া কিশোর ও উঠতি সন্ত্রাসীর সংখ্যা আরও বেশি। এদের অনেকে বিরুদ্ধেও কারাগার থেকে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ পাচ্ছে পুলিশ। 

গত মাসে খুলনা বিভাগীয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বলা হয়, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। তাদের বিরুদ্ধে করা মামলার বেশির ভাগই জামিন অযোগ্য ধারার। তার পরও তারা জামিন পাচ্ছেন। এতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মনোবল দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

গত ২৪ জুন ভোরে খুলনায় মসজিদে ঢুকে দুই ব্যক্তিকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। গুলিবিদ্ধ হন ব্যবসায়ী লোকমান হাকিম ও আলম শেখ (৫৫)। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা হয়। সাজ্জাদ হোসেন নামে একজন আটকের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, ওই ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আরমান হোসেন মোল্লা। 

থানা সূত্র জানায়, গত বছরের ৭ মে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। হত্যা, আগ্নেয়াস্ত্র, দস্যুতাসহ অন্তত সাতটি মামলার আসামি আরমান। ছয় মাস পর গত ২৮ নভেম্বর তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। এর পর থেকে আত্মগোপনে থাকলেও একাধিক নতুন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর নাম এসেছে। 

ব্যবসায়ী লোকমান হাকিমকে হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দৌলতপুর থানার এসআই জাকিরুল ফিরোজ বলেন, আরমানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ব্যবসায়িক বিরোধে হত্যার উদ্দেশ্যে মসজিদে ঢুকে ব্যবসায়ী লোকমান হাকিমকে গুলি করা হয়। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। 

শুধু আরমান নন, জামিনে মুক্ত হওয়া বাকি ১৪ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীও বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। পুলিশ জানায়, তালিকাভুক্তদের পাশাপাশি পুলিশের তালিকার বাইরে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য ও উঠতি সন্ত্রাসী জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়েছেন। 

গত ১৮ জুন খুলনা বিভাগীয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভায় অংশ নেওয়া খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন প্রতিনিধি বলেন, আদালতে পাঠানো আবেদন (ফরওয়ার্ডিং) কোনো দুর্বলতা রাখা হয় না। তবে আসামিরা দ্রুতই ছাড়া পাচ্ছেন। 

খুলনা মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে মহানগরী এলাকায় ৯১টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ২১টি।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলাগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের শেষ তিন মাসে ৫৫ জন, গত বছর ১২৭ জন এবং চলতি বছরের ২০ জুন পর্যন্ত ১২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের বড় অংশ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

জামিনে ছাড়া পাওয়া সন্ত্রাসীরা
আরমান বাদে জামিনে ছাড়া পাওয়া অন্য ১৪ সন্ত্রাসী হলেন– খুলনা সদর থানার পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী তাওহিদুল ইসলাম তুহিন ওরফে কালা তুহিন, আদালতের সামনে জোড়া খুনের আসামি এজাজুল হোসেন, শামীম শেখ ওরফে টুন্ডা শামীম, গ্রেনেড বাবুর ভাই রাব্বি চৌধুরী, সাকিবুর রহমান জিতু, নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম, দৌলতপুর থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হোসেন ঢালী, আরমান হোসেন, ইসতিয়াক শাহরিয়ার, কাজী রায়হান ইসলাম, আসিফ মোল্লা, সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী শামীম সরদার ওরফে ঢাকাইয়া শামীম, রনি শেখ ওরফে কাবা, মনিরুল ইসলাম বাবু ওরফে পুরি বাবু ও কসাই লিটন। 

পুলিশের নথি থেকে জানা গেছে, খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর অন্যতম সহযোগী কালা তুহিনের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মাদকের ১৫টি মামলা আছে। আদালতের সামনে জোড়া খুন মামলার আসামি ইজাজুল হোসেনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকের ছয়টি মামলা; শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. শামীম শেখ ওরফে টুন্ডা শামীমের বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, অস্ত্র ও মাদকের ছয়টি মামলা; গ্রেনেড বাবুর ভাই রাব্বি চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, অস্ত্রের চারটি; সাকিবুর রহমান জিতুর বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ডাকাতির ১৪টি মামলা আছে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমের বিরুদ্ধে হত্যা, দস্যুতা, মাদকসহ এক ডজন মামলা; দৌলতপুর থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হোসেন ঢালীর বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ ছয়টি মামলা আছে। ইসতিয়াক শাহরিয়ার, কাজী রায়হান ইসলাম ও আসিফ মোল্লার বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ তিনটি করে মামলা; সোনাডাঙ্গা থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া শামীমের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতিসহ সাতটি মামলা আছে।

জনমনে উদ্বেগ
গত ২৪ মে খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার কুবা মসজিদ এলাকার একটি বস্তিতে রাসেল নামে এক যুবককে লক্ষ্য করে গুলি করেন সন্ত্রাসীরা। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এক নারীর হাতে বিদ্ধ হয়। পুলিশ জানায়, পূর্বশত্রুতার জেরে এ হামলা হয়। শামীম সরদার ওরফে ঢাকাইয়া শামীম এতে অংশ নেন। 

পুলিশ জানায়, ঢাকাইয়া শামীম খুলনার এনসিপি নেতা মোতালেব শিকদারকে হত্যাচেষ্টা মামলারও প্রধান আসামি। গত ২৬ ডিসেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। গত ১৩ মে জামিনে ছাড়া পান তিনি। মুক্তির ১১ দিনের মাথায় ২৪ মে তিনি কুবা মসজিদ এলাকার ঘটনায় অংশ নেন। 

গত ৩০ নভেম্বর দুপুরে আদালতের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে দুই যুবককে হত্যা করা হয়। ভয়ে নিহতের পরিবার মামলা করেনি। তিন দিন পর পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ দেখে ১৮ ডিসেম্বর শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর গঠিত গ্রুপ ‘বি কোম্পানি’র সদস্য ইজাজুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। পরে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া সাতজনের নাম প্রকাশ করেন তিনি। এতে স্বস্তি প্রকাশ করেন হত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্বজন। কিন্তু গত ৩০ এপ্রিল কারাগার থেকে ছাড়া পান ইজাজুল।

নিহত ফজলে রাব্বী রাজনের এক স্বজন বলেন, ‘আমরা জানতাম, খুনের বিচার সহজে হবে না। মামলা করলে পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়বে। এ জন্য মামলা করিনি। আসামিরা এখন বাড়িতে এসে সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে।’

গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সাকিবুর রহমান জিতুসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে জিতুর স্বীকারোক্তিতে সহযোগী জাহাঙ্গীর হোসেন মিয়া, শাওন ও সোহেল রানা ওরফে উজ্জ্বল শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের গ্রেপ্তারে টুটপাড়াসহ আশপাশ এলাকার মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন। গত ২৮ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পেয়েছেন জিতু। 

যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লা ও ইউপি সদস্য আরিফ মোল্লা হত্যা মামলার আসামি কাজী রায়হান ইসলাম ও আসিফ মোল্লাকে গত বছর ১৭ জুলাই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দুজনই দৌলতপুর থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। আসিফ ৯ ডিসেম্বর এবং রায়হান ২০ মে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

মাহাবুবের বাবা ও মামলার বাদী আবদুল করিম মোল্লা বলেন, সন্ত্রাসীরা জামিন পাওয়ায় পরিবারের অন্য সদস্যরা ভয়ের মধ্যে রয়েছে।

খুলনার পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, অপরাধ দমনে নগরীর আটটি থানায় ১৮১ জন সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরি করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৪০-৫০ জনকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ধর্ষ এসব সন্ত্রাসী কয়েক মাসের মধ্যেই জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আদালতকে তাদের তৎপরতার বিষয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’

ছাড়া পেয়ে আবার অপরাধে
গত ৮ মে বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের রাঙ্গামারি এলাকায় আজিজুল ইসলাম নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশের তদন্তে এ ঘটনায় কালা তুহিনের সম্পৃক্ততা উঠে আসে। তুহিনকে ধরিয়ে দিতে তথ্য দিয়েছেন আজিজুল– এলাকায় এমন আলোচনা ছিল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তোফায়েল রনি বলেন, নিহতের স্ত্রী অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছিলেন। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে অনেকের নাম এসেছে। তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা যাবে না।

গত ১৯ মার্চ রাতে লবণচরা থানার কৃষ্ণনগর এলাকার কাজী রাশেদের বাড়িতে ঢুকে পরিবারের চারজনকে গুলি করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় সন্ত্রাসী ইমরানসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। গত মে মাসে তারা জামিনে ছাড়া পান। গত ২ জুন বাড়ি থেকে কাজী রাশেদকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন সন্ত্রাসীরা। 

লবণচরা থানার ওসি সৈয়দ মোশারেফ হোসেন বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্প্রতি ইমরানও আটক হয়েছেন।

গত ১৬ মার্চ দৌলতপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাশিকুল আনাম রাশুকে গুলি করে হত্যা করেন সন্ত্রাসীরা। এ হত্যাকাণ্ডে সন্ত্রাসী নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম ও আরমানের নাম উঠে আসে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অমিত দাস বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে কাদের নাম এসেছে, সে ব্যাপারে কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না। গত ১১ জুন চাঁদার দাবিতে শেখপাড়া এলাকার ইসমাইল আয়রন মার্কেট বন্ধ করে দেন সন্ত্রাসী পুরি বাবু। টানা চার দিন মার্কেট বন্ধ ছিল। পুরি বাবু গত ৭ মে বিচারিক আদালত থেকে জামিন পান।

খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপকমিশনার মো. রেজাউর রহমান বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করছি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’ 

এ ছাড়া জামিনে বের হওয়া কসাই লিটন, হোসেন ঢালী, রাব্বি চৌধুরী, টুন্ডা শামীম, ইসতিয়াক শাহরিয়ার, রনি শেখের নাম এসেছে মাদক, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতের ঘটনায়।

খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এ কে এম শহিদুল আলম বলেন, আসামিরা নিম্ন ও উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেওয়ার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে কোন না কোনো আদালত থেকে তারা জামিন পান। তিনি বলেন, ‘আমরা অপরাধীদের কর্মকাণ্ড আদালতের কাছে তুলে ধরি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, ‘জামিন পাওয়া সবার অধিকার। তবে জামিনের ক্ষেত্রে শুধু এফআইআর দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সমাজের পরিস্থিতি মাথায় রাখা প্রয়োজন। একজনের জামিন সমাজকে ঝুঁকিতে ফেললে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অধিকার গুরুত্ব পাওয়ার কথা।’