দেশে বিদ্যুতের ঘাটতির চেয়ে এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে বিদ্যুতের ‘অতিরিক্ত সক্ষমতা’। আগামী পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ চাহিদা ২৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। তবু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চেয়েছিল ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াটের সক্ষমতা তৈরির। আর উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান সরকারেরও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখার খরচ, অর্থাৎ ক্যাপাসিটি চার্জ আরও বাড়বে। যার চাপ শেষ পর্যন্ত পড়বে সরকারের ভর্তুকি এবং সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলের ওপর। তাদের দাবি, অতীতের ভুল পরিকল্পনার বোঝা এখনই পুরোপুরি নামানোর সুযোগ নেই; তবে বর্তমান সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
চাহিদার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে সক্ষমতা, বাড়ছে দুশ্চিন্তা
বাংলাদেশে বিদ্যুতের ব্যবহার প্রতি বছর বাড়ছে। তবে সেই বৃদ্ধির গতি বিবেচনায় নিলেও ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা হবে প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াট। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জরুরি পরিস্থিতি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রাখা হয়, যাকে স্পিনিং রিজার্ভ বলা হয়। সেই হিসাবেও ২০৩০ সালে দেশের মোট প্রয়োজন ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হচ্ছে। বাস্তবে বর্তমানে নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো শেষ হলে এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এলে সক্ষমতা প্রায় ৩৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। যদিও এর মধ্যে কিছু পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাবে, তবু প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত সক্ষমতা থেকেই যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতিরিক্ত সক্ষমতার অর্থ হলো আরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকবে, অথচ সেগুলোর জন্য সরকারকে নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসানও কমবে না। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ সামলাতে সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হবে অথবা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথেই হাঁটতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব: এর থেকে উত্তরণের সমীকরণটাও বেশ জটিল। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার লক্ষ্য নির্ধারণ করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হয়েছিল। তাই বর্তমান সরকার চাইলেও এই পরিস্থিতি থেকে এখনই বেরিয়ে আসার সুযোগ খুব বেশি নেই।
জানা গেছে, দেশে এখন ৩১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন, যেগুলোর কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক এবং মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। এ ছাড়া আরও ১৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন, যেগুলোর মোট সক্ষমতা ৫৬৫ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৭ সালে উৎপাদনে আসার কথা।
এদিকে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনার কথাও ঘোষণা দিয়েছে।
চাহিদার পূর্বাভাস কতটা বাস্তবসম্মত: বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ চাহিদা সাধারণত দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির হার জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় ১ দশমিক ০৩ গুণ।
তবে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের চাহিদা— দুটিই বাস্তবতার তুলনায় বেশি ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর ফলেই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
২০১০ সালের বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনায় ২০১৫ সালে বিদ্যুতের চাহিদা ১০ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট ধরা হলেও বাস্তবে তা ছিল প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। একইভাবে ২০২০ সালে ১৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট এবং ২০২৫ সালে ২৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। অথচ এখন পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি বাড়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও অতীতের অভিজ্ঞতায় তা পুরোপুরি বাস্তবায়নের নজির খুব বেশি নেই। তবু সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে হিসাব করলে ২০৩০ সালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
গত এক দশকের চিত্রও একই কথা বলছে: বিগত ১০ বছরের পরিসংখ্যানও দেখায়, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট করে বেড়েছে। ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় সাড়ে ৮ হাজার মেগাওয়াট। ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয় ৯ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট, ২০১৮ সালে সাড়ে ১১ হাজার, ২০১৯ সালে ১২ হাজার ৬০০, ২০২০ সালে প্রায় ১২ হাজার, ২০২১ সালে ১২ হাজার ৭০০, ২০২২ সালে ১৪ হাজার ২০০, ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৫৫০, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪৭৭ এবং ২০২৫ সালে প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ মেগাওয়াট। চলতি বছর সর্বোচ্চ চাহিদা বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বন্ধ থাকা প্রায় ৫০০ শিল্পকারখানা আবার চালু হলে বা নতুন বিনিয়োগ বাড়লে বছরে চাহিদা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাতেও ২০৩০ সালে প্রকৃত চাহিদা প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যেই থাকবে।
ক্যাপাসিটি চার্জের বাড়তি বোঝা: বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের বড় দুটি অংশ হলো জ্বালানি ব্যয় এবং ক্যাপাসিটি চার্জ। ক্যাপাসিটি চার্জের আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিনিয়োগ, সুদ, মুনাফা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও চুক্তি অনুযায়ী এই অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়।
বর্তমানে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। প্রকৃত গড় উৎপাদন আবার ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকে। শীতকালে চাহিদা অনেক সময় ১০ হাজার মেগাওয়াটেরও নিচে নেমে আসে। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকে। অথচ তাদের জন্য নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। গত ১৫ বছরে শুধু এই খাতে রাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়মুক্তি আইনের আওতায় প্রতিযোগিতা ছাড়াই বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
এই চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ক্যাপাসিটি চার্জকে চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্রও তুলে ধরা হয়।
সরকারের অবস্থান: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এখন ক্যাপাসিটি চার্জ।
অন্যদিকে, গত ৬ জুন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আগের সরকারের ভুল নীতির কারণেই বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এখন বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও অলস কেন্দ্রগুলোর জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, আগের সরকারের ভুল পরিকল্পনা, অনিয়ম ও লুটপাটের ফলেই বিদ্যুৎ খাতে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে ভর্তুকি এবং ভোক্তার ওপর চাপ— দুটিই দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সমস্যাকে আরও জটিল করতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেছেন, বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী ২০৩০ সালে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় রিজার্ভ মার্জিন অনেক বেশি হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং আরও বেশি ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হতে পারে।
তিনি আরও বলেছেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেই হবে না, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানিরও নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অতীতে এলএনজির দাম বাড়লেও কয়লার অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়নি। তাই সংকটের আগেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নিতে হবে।
তার মতে, বর্তমান সরকারের হাতে তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। কারণ, বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প এরই মধ্যে নির্মাণাধীন। তবে ২০৩০ সালের পর ধাপে ধাপে পুরনো ও অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা, নতুন করে অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্রের মেয়াদ না বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
২০২৪ সালের ২৩ জুন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সময়ে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে প্রায় ১৯ হাজার ৩৭৭ মেগাওয়াট। ২৫ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন যোগ করলেও মোট প্রয়োজন হবে প্রায় ২৩ হাজার ২৫২ মেগাওয়াট।