গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে হামাস। তবে সংগঠনটির সামরিক শাখা বহাল থাকবে। ফলে এটি প্রকৃত অর্থে ক্ষমতা হস্তান্তর, নাকি কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা।
গত ৬ জুলাই হামাসের গভর্নমেন্ট মিডিয়া অফিস জানায়, জরুরি সরকারি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে বিলুপ্ত করা হয়েছে কমিটিও ।
যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর কাছে প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের পথ সহজ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানায় হামাস।
১৫ সদস্যের এই টেকনোক্র্যাট কমিটি মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার আওতায় গঠিত হয়। পরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবেও এর অনুমোদন আসে।
গত কয়েক মাস ধরেই প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল হামাস । বিশ্লেষকদের মতে, গাজার মানবিক সংকট ও রাজনৈতিক বিভক্তি কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে এ উদ্যোগের পেছনে। যদিও সশস্ত্র সক্ষমতা ধরে রাখতে চায় সংগঠনটি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষকে জিম্মি করা হয়। পাল্টা হামলায় বর্বর হয়ে ওঠে ইসরায়েল। বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে গাজায় । স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে ভূখণ্ডের বড় একটি অংশ।
২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০০৭ সালে ফাতাহর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয় হামাসের। একপর্যায়ে পুরো ভূখন্ডের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রন নেয় হামাস।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজারের মতে, হামাসের এই ঘোষণা মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা। তার ভাষায়, গাজার পুনর্গঠন সম্ভব করতে হলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এমন একটি বেসামরিক টেকনোক্র্যাট প্রশাসন প্রয়োজন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রশাসনে রাজনৈতিক নিয়োগ নয়, বরং প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী ও প্রশাসকদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা। তাদের কাজ হবে স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য মৌলিক সেবা পরিচালনা এবং পুনর্গঠন তদারকি। বর্তমান সরকারি কর্মচারীরা দায়িত্বে থাকবেন। তবে তাদের ভূমিকা হবে বেসামরিক। হামাস নিরস্ত্রীকরণের মতো বিতর্কিত বিষয় আপাতত আলোচনার বাইরে রাখা হবে।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম এই পদক্ষেপকে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পথে ইতিবাচক অগ্রগতি বলে উল্লেখ করেন। তার দাবি, ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার অজুহাত দূর করতেই এ সিদ্ধান্ত।
তবে ইসরায়েল দ্রুতই এই ঘোষণাকে 'নাটক' বলে উড়িয়ে দেয়। ইসরায়েলপন্থী বিশ্লেষকদের মতে, হামাস নামমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ছে। তবে অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখার ক্ষমতা নিজেদের হাতেই রাখছে। তাদের মতে, প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য হামাসের সশস্ত্র কাঠামো ভেঙে দেওয়া, নিরাপত্তা বাহিনীর পুনর্গঠন এবং প্রশাসনকে দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই হয়নি।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, হামাসের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে অস্ত্রের প্রশ্ন। তার মতে, বৈধ বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র ক্ষমতা ছাড়া কোনো সরকার কার্যকর হতে পারে না। আহমেদ নাজারের মতে, হামাস সত্যিই পেছনে সরে যাচ্ছে, নাকি কেবল ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ করছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গাজার বর্তমান পরিস্থিতি যে নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থার দাবি করছে, হামাসের এই পদক্ষেপ সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি।