Image description

বেড়াতে গিয়ে পরিচয়, এরপর প্রেম। সেই প্রেমের স্মৃতি হয়ে থাকা কিছু ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও। এরপর সম্পর্কে ভাঙন। নতুন বিয়ের আয়োজন, ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ এবং পরিকল্পিত হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে আলামত গুমের চেষ্টা। চার ঘণ্টার কিলিং মিশনে অংশ নিয়েছিলেন প্রেমিকা ও তার হবু বর।

প্রায় চার বছর আগে মাদারীপুরের শিবচরে তরুণ কাজী ইসমাইল হোসেন (ইমন) হত্যাকাণ্ডের যে রহস্য থানা পুলিশের তদন্তে চাপা পড়ে গিয়েছিল, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুনঃতদন্তে উঠে এসেছে তার ভয়ংকর চিত্র।

পিবিআই বলছে, ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই ইমনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন কলেজছাত্রী লাবণী আক্তার ও তার হবু স্বামী কামরুজ্জামান। হত্যার আগে এনার্জি ড্রিংকে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয় তাকে। পরে আড়িয়াল খাঁ মরা নদীর তীরে নিয়ে গলায় ছুরি মেরে ফেলে দেওয়া হয় পানিতে। হত্যার আলামত নষ্ট করতে তার মোবাইল ফোন, ঘড়ি, মানিব্যাগ, জুতা, শার্ট ও ব্যবহৃত ছুরি ফেলে দেওয়া হয় নদীতে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৫ মে সন্ধ্যায় শিবচরের সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের খাসচর বাঁচামরা গ্রামের আড়িয়াল খাঁ মরা নদীর উত্তর পাড়ে পানি থেকে ইমনের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরের দিন পরিবারের পক্ষ থেকে শিবচর থানায় একটি মামলা করা হয়। হত্যা মামলায় প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও আড়ালেই থেকে যায় প্রকৃত ঘটনা। হত্যায় জড়িতদের বাদ দিয়ে দাখিল করা হয় অভিযোগপত্র। পরে বাদীপক্ষ নারাজি দিলে আদালতের নির্দেশে মামলাটি আসে পিবিআইয়ের হাতে। পুনঃতদন্তে উন্মোচন হয় পুরো ঘটনা।

পরিচয় থেকে প্রেম

এসএসসি পরীক্ষার পর শিরয়াইল ইউনিয়নের শোলপুর গ্রামে নানাবাড়ি বেড়াতে যান লাবণী আক্তার। সেখানে মামাতো বোন সুমির ফুফাতো দেবর কাজী ইসমাইল হোসেন ইমনের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ইমন তখন ঢাকায় একটি কলেজে মাস্টার্সে পড়াশোনা করতেন। পরিচয়ের সূত্র ধরে দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। পরবর্তী সময়ে শারীরিক সম্পর্কও হয় তাদের।

ওই সময় কৌশলে নিজের মোবাইল ফোনে লাবণীর কিছু ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন ইমন। সম্পর্কের বছরখানেক যেতে না যেতেই টানাপড়েন থেকে ভেঙে যায় তাদের সম্পর্ক। এরপর লাবণীর বিয়ে ঠিক হয় বিজিবি সদস্য কামরুজ্জামানের সঙ্গে। তখন সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করেন ইমন। এতে রাজি না হলে লাবণীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন ইমন।

হত্যার পরিকল্পনা যেভাবে

ইমনের হুমকির বিষয়টি হবু স্বামী কামরুজ্জামান ওরফে কামরুলকে জানান লাবণী। এরপরই ইমনকে দুনিয়া থেকে সরাতে নীরবে সাজানো হয় মৃত্যুর ছক। পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২১ সালের ১৪ মে ঈদের দিন দুপুরে লাবণী আক্তার ফোন করে দেখা করতে বলেন ইমনকে। বিকালে আসরের নামাজের পর শিবচরের সূর্যনগর এলাকায় যান লাবণী। সেখানে তার সঙ্গে দেখা হয় হবু স্বামী কামরুজ্জামান (কামরুল), কামরুলের মামাতো ভাই তোবারক ফরাজী ওরফে মেহেদী এবং সানজিদার।

 

 

সূর্যনগরে পৌঁছানোর পর সানজিদাকে নিজের খালাতো বোন হিসেবে লাবণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন কামরুল। পরে লাবণী ও সানজিদা একটি ভ্যানে করে রওনা হন। পথেই লাবণীর হাতে একটি এনার্জি ড্রিংকের বোতল ও একটি ফল কাটার ছুরি তুলে দেন সানজিদা। তদন্তে বলা হয়েছে, পানীয়টিতে ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল এবং ছুরিটি আগেই সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। লাবণী জানতে চেয়েছিলেন, এসব দিয়ে কী করা হবে। জবাবে সানজিদা বলেছিলেন, ‘পানীয়টি ইমনকে খাওয়াতে হবে, আর ছুরিটি ব্যাগে রাখতে হবে।’

যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড

বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে তাদের সঙ্গে মিলিত হন ইমন। পরে লাবণী, সানজিদা, ইমন ও ইমনের চাচা জামাল হোসেন মাতুব্বর একসঙ্গে যান ইলিয়াছ আহমেদ চৌধুরী কলেজ মাঠে। সেখানে কিছু সময় গল্প করেন তারা। পরে ইমনের চাচা চলে গেলে সানজিদার দেওয়া সেই পানীয় ইমনকে খেতে দেন লাবণী। এরপর কলেজের পেছনে বসে পুরনো সম্পর্কের নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় তাদের। তখন লাবণী ইমনের কাছে জানতে চান, তাদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও কোথায় আছে। ইমন জানান, সেগুলো তার কাছে নেই। লাবণী তার মোবাইল ফোনও পরীক্ষা করেন, কিন্তু কিছুই পাননি।

 

 

এরপর সেখান থেকে লাবণী, সানজিদা ও ইমন অটোরিকশায় করে রওনা হন পুরনো ফেরিঘাটের দিকে। অটোর পেছনের আসনে বসেছিলেন ইমন; দুই পাশে ছিলেন লাবণী ও সানজিদা। সামনে চালকের দুই পাশে ছিলেন কামরুজ্জামান ও মেহেদী। ফেরিঘাটের কাছাকাছি গিয়ে নেমে পড়েন তারা। ধীরে ধীরে এগিয়ে যান নদীর পাড়ের নির্জন স্থানে। শরীর খারাপ লাগছে জানিয়ে ঘাসের ওপর বসে পড়েন ইমন।

তদন্তে বলা হয়েছে, এরপর লাবণী ও ইমন ব্যক্তিগত ছবি মুছে ফেলার বিষয় নিয়ে কথা বলেন। কিছু সময় পর সেখানে আসেন কামরুজ্জামান। কথাবার্তার একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামতে থাকে আড়িয়াল খাঁ মরা নদীর পাড়ে। প্রায় দুই ঘণ্টার কথাকাটাকাটি, বাগ্‌বিতণ্ডা, অনুনয়-বিনয়ের পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে একপর্যায়ে লাবণী প্রথমে ছুরি দিয়ে ইমনের গলায় আঘাত করেন। পরে কামরুজ্জামান ছুরি নিয়ে আরও আঘাত করেন। নিথর হয়ে পড়া ইমনকে এরপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয় নদীর পানিতে। শেষ পর্যন্ত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয় সব চিহ্ন। নদীতে ফেলে দেওয়া হয় ইমনের শার্ট, মোবাইল ফোন, ঘড়ি, মানিব্যাগ, জুতা এবং হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিও। পরদিন ১৫ মে বিকালে আড়িয়াল খাঁ মরা নদী থেকে ইমনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

রহস্য উন্মোচন যেভাবে

তদন্তে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হত্যার আগে ও পরে অভিযুক্তদের চলাচলের পুরো ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠন করে পিবিআই। ঘটনাস্থল, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. ফিরোজ আহমেদ জানিয়েছেন, আদালতের অনুমতি নিয়ে কোর্ট পুলিশ পরিদর্শকের কক্ষে লাবণী আক্তারসহ জামিনে থাকা আসামিদের কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরবর্তী সময়ে লাবণীর কিছু কথার সূত্র ধরেই তদন্ত শুরু করে পিবিআই। তদন্তের একপর্যায়ে রহস্য উন্মোচন হয় এই হত্যাকাণ্ডের। পরবর্তী সময়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন লাবণী।