Image description

কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের পিচ ও খোয়া উঠে গেছে। তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ। কোথাও কোথাও সড়ক ধসেও গেছে। এতে যানবাহন চলাচলে ভোগান্তি থেকে শুরু পরে এসব খানাখন্দ দীর্ঘ সময়ের ভোগান্তির কারণে হবে নগরবাসীর। দীর্ঘ সময় সড়কে পানি আটকে থাকার ফলে নিচের মাটি আর সড়কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া জলাবদ্ধতার মধ্যে নগরের বিভিন্ন সড়কে চলমান খোঁড়াখুঁড়ি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে। বৃষ্টির পানিতে কাটা রাস্তা ও খানাখন্দ দেখা না যাওয়ায় পথচারীদের সতর্ক হয়ে চলাফেরা করতে হচ্ছে। এর পরও গর্তে পা পড়ে অনেকে আহত হয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারী বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কের ক্ষতি হয়েছে। পানি সরে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে অনেক স্থানে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার। অলিগলির অবস্থা খুবই খারাপ। রাস্তার গর্তগুলো আপাতত ইট-সুরকি দিয়ে যান চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। গুলশান লেকের পানি উপচে গুলশান-শাহজাদপুর সংযোগ সড়কের দক্ষিণ পাশের একটি অংশ ধসে পড়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। পুরান ঢাকার ধোলাইখাল সংলগ্ন নারিন্দা মোড়ে ওয়াসার পুরোনো পানির পাইপ ফেটে মাটি সরে যাওয়ায় সেখানেও সড়ক ধসে গেছে। ফলে ওই রুটে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ভাঙনের পাশাপাশি সড়কের মাঝেও গর্ত তৈরি হয়েছে।

গুলশান-শাহজাদপুর সংযোগ সড়কের ধস নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা গণেশ চন্দ্র কর্মকার বলেন, সড়কের নিচ দিয়ে দুটো পাইপ দিয়ে লেকের দুই অংশ যুক্ত। কয়েকদিন অতিরিক্ত বৃষ্টিতে আবর্জনা জমে পাইপ জ্যাম হয়ে যায়। পরে পানি রাস্তার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া শুরু হলে একপর্যায়ে রাস্তা ভেঙে যায়।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ব্যবসায়ী জব্বার হোসেনের মতে, পানি প্রবাহের জন্য দুটি পাইপ পর্যাপ্ত ছিল না।

স্থানীয় বাসিন্দা শায়লা বেগম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ছোট ছেলেমেয়েরা ভাঙা রাস্তার পানির ধারে খেলছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

পুরান ঢাকার ধোলাইখাল সংলগ্ন নারিন্দা মোড়ে রাস্তা ধসের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা রজব আলী বলেন, ‘রোববারের টানা বর্ষণের মধ্যে বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই রাস্তাটি দেবে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে আশপাশের অংশও ভেঙে পড়ে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ‘রাস্তার নিচে থাকা ওয়াসার একটি বেশ পুরোনো পাইপ লিক করেছিল। সেখান থেকে পানি বেরিয়ে নিচের মাটি সরে যাওয়ার ফলেই সড়কটি ধসে পড়ে। আমরা কাজ শুরু করেছি, তবে পুরো মেরামত সম্পন্ন হতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে।’

সরেজমিন দেখা যায়, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সড়কের মিন্টো রোড-সংলগ্ন এলাকায় কিছুদিন আগে করা সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে। কাকরাইল মসজিদ থেকে ফকিরাপুল-আরামবাগ হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত সড়ক খানাখন্দে ভরা। একই অবস্থা স্বামীবাগ ও দয়াগঞ্জ এলাকায়। যাত্রাবাড়ী থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভার পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়কের একই অবস্থা।

চকবাজারের ইমামগঞ্জ থেকে মিটফোর্ড রোড পর্যন্ত সড়কজুড়ে কাদাপানির কারণে হাঁটা দায়। সোয়ারীঘাট থেকে লালবাগ-চকবাজার পর্যন্ত সড়কের বড় অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কাদাপানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ময়লার স্তূপ। রিকশাচালক হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘কাদা আর গর্তের কারণে রিকশা চালাতে খুব কষ্ট হয়। যাত্রীরাও এ পথে আসতে চান না। একেকটা ট্রিপে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ লেগে যায়।’

ঢাকা-ময়মনসিংহ প্রধান সড়কের উত্তরা রাজলক্ষ্মী এলাকায় সড়কের বেহাল অবস্থা। বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দে সড়কে যানবাহন চলা প্রায় বন্ধ। সিটি করপোরেশন শুধু দায়সারা কাজ করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টিতে রাস্তাটিতে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে। সিটি করপোরেশনের লোকজন এসে দেখে গেছেন অনেকবার। রাস্তা ঠিক না করে ইট দিয়ে গর্ত ভরাট করেছে, বুলডোজার দিয়ে সমান করেছে। এতে রাস্তা আরও নিচু হয়ে গেছে।’

বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবো, মতিঝিল, মৌচাক, মালিবাগ, শান্তিনগর, শান্তিবাগ ও কাকরাইল এলাকার সড়কে নিচু অংশে দিনের পর দিন পানি জমে থাকায় ওপরের স্তর আলগা হয়ে কোথাও কোথাও উঠে গেছে। দুর্বল সড়ক কাঠামোয় ভারী যানবাহন চলায় ওপরের স্তর উঠে খোয়া ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।

এসব সড়কে চলাচল করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে যানবাহনকে। এরই মধ্যে ধোলাইখাল সড়ককে চলাচল উপযোগী করার জন্য ডিএসসিসি মেরামত কাজ শুরু করেছে। কিন্তু অন্যগুলোতে কার্যক্রম শুরুই হয়নি। এ বিষয়ে ডিএনসিসির এক প্রকৌশলী বলেন, ‘আপাতত সেগুলোকে বালু-সুরকি দিয়ে সমান করে দেওয়া হবে। কারণ বৃষ্টির কারণে কার্পেটিং করা সম্ভব নয়। এগুলো আঞ্চলিক অফিস থেকে মেরামত করে দেবে রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে। বর্ষা মৌসুম শেষে কাজ শুরু হবে।

গুলশান-শাহজাদপুর সংযোগ সড়কের অংশ ধসে পড়া নিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘লেকের দুই অংশের মধ্যে পানি চলাচলের জন্য থাকা সীমিত পাইপের পরিবর্তে ভবিষ্যতে পুরো অংশটি উন্মুক্ত রেখে ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে লেকের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। রাজউককে সেখানে রাস্তার পরিবর্তে একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হবে, যাতে লেকের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়। প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানাবেন।

ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বাজেটের কিছু স্বল্পতা আছে। এ জন্য দ্রুতই ভালো কিছু করা সম্ভব হবে না। কিন্তু ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত ধারণক্ষমতা। যেখানে ২০ জন মানুষ বসবাস করা স্বাভাবিক, সেখানে বাস করছে ২০০ জন। আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থারও দুর্বলতা আছে। এ রকম হলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একসময় শনির আখড়া-ডেমরা এলাকায় অনেক নিচু জলাশয় ছিল। সেগুলো ভরাট করে ঘরবাড়ি উঠছে। পানি নামার জায়গা নেই। এতে রাস্তায় পানি জমছে। রাস্তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।’

যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে রাজধানীতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় সড়কের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে নিচু ভূমি ভরাট করে গড়ে ওঠা এলাকায় এ ঝুঁকি আরও বেশি। ঢাকার অনেক এলাকায় নিচু ভূমি ভরাট করে জনবসতি ও সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এসব জায়গার মাটির প্রকৌশলগত সক্ষমতা সবসময় সমান নয়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে সড়কের নিচের মাটিতে কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়, যা পরে সড়কে ক্ষয় ও ধসের কারণ হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বিটুমিনের সবচেয়ে বড় শত্রু হল পানি। দীর্ঘ সময় পানির সংস্পর্শে থাকলে বিটুমিন আর পাথরকে ধরে রাখতে পারে না। ফলে বিটুমিন আলাদা হয়ে যায়, পাথর খুলে আসে এবং ধীরে ধীরে সড়ক ভেঙে পড়তে শুরু করে। রাজধানীর অধিকাংশ সড়কই নমনীয়। সব সড়ক কংক্রিট বা রিজিড পেভমেন্টে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। কারণ এতে প্রাথমিক ব্যয় অনেক বেশি। তাই কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাই এ ধরনের সড়ক রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।’

রাজধানীতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে সড়ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পানির কারণে শুধু সড়কের ওপরের বিটুমিন স্তর নয়, নিচের সাবগ্রেড বা ভিত্তি মাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে। ঝুঁকি শুধু সড়কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিচু ভূমি ভরাট করে নির্মিত অনেক ভবনও দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতায় থাকলে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় কাদামাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে, সেখানে এ ঝুঁকি বেশি।’

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘ভারী বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও পানির তীব্র স্রোতে মাটির নিচের স্তর দুর্বল হয়ে ভাঙনের ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া যেসব সড়ক দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে, সেগুলোর বিটুমিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় খানাখন্দ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেসব সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো মেরামতের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। তবে বৃষ্টি না থামলে এবং রাস্তা শুকানোর সুযোগ না হলে মেরামতের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়।’