Image description

গাইবান্ধায় উঁচু একটি রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসকে অর্থপাচার মামলায় গ্রেফতার করেছে বাংলাদেশের পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অবশেষে মানি লন্ডারিং ও প্রতারণার মামলায় আবারও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে ধরা পড়েছেন হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ওরফে তাওহীদ ইসলাম।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম হরিদাসের। তাকে গ্রেফতারের পর সোমবার সিআইডি জানিয়েছে, তিনি ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইচএসসি পাশ করেন। তবে মঙ্গলবার এ তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটি জানিয়েছে, এ তথ্যের সত্যতা এখনো যাচাই করা হচ্ছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সূত্র বলছে, পঞ্চম শ্রেণির পরই পড়াশোনা ছেড়ে দেন হরিদাস। ২০০০ সালের দিকে ভারতে গিয়ে প্রায় ৯ বছর অবস্থান করেন। সেখানে ইলেকট্রনিক্স কাজ শেখার পর দেশে ফিরে ঢাকার উত্তরায় এসি মেকানিক হিসাবে কাজ শুরু করেন। কিছুদিন পুরোনো এসি বিক্রি ও মেরামতের ব্যবসাও করেন। একসময় সবজি বিক্রির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। 

তদন্তে জানা যায়, ২০১৪ সাল থেকেই হরিদাসের আর্থিক উত্থান শুরু হয়। ২০১৮ সাল থেকে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার জাল বিস্তার করেন। ২০১৯ সালে বিয়ের পর ধর্মান্তরিত হয়ে নাম রাখেন তাওহীদ ইসলাম। শ্বশুরের পরিচয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় জমি কেনেন এবং স্থানীয়দের কাছে নিজেকে বিত্তশালী ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত করেন। একই সঙ্গে চাকরি দেওয়া, বদলি করানো, সরকারি টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ছয়-সাত বছরের ব্যবধানে প্রতারণার মাধ্যমে তিনি প্রায় ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। সেই অর্থের একটি বড় অংশ দিয়ে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক’ নামে একটি রিসোর্ট নির্মাণ করেন। 

ওই রিসোর্টকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হতো। ২০২২ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মচারীর বদলি বাতিলে ভুয়া ডিও লেটার ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে হরিদাসের প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে। সেসময় রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে হরিদাসকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

তবে ওই গ্রেফতারের পরও থেমে থাকেননি হরিদাস। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তিনি আবার পলাশবাড়ীতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। নিজ ধর্মে ফিরে গিয়ে স্থানীয় একটি কালীমন্দির সংস্কার ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। মন্দিরটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালীমন্দির’।

প্রথমে মন্দির প্রাঙ্গণে ৫১ ফুট উঁচু কৃষ্ণমূর্তি স্থাপন করা হয়। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেখানে ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সে সময় হরিদাস সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছিলেন, এতে প্রায় ৪১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপর থেকে অর্থের উৎসসহ বিভিন্ন জটিলতায় ১১ জুন মন্দির কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই কাজ স্থগিত ঘোষণা করে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মন্দিরকেন্দ্রিক প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পনাধীন বৃদ্ধাশ্রমের সদস্য পদের নামে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ হাজার ১ টাকা করে নিয়েছেন হরিদাস। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার মানুষ সদস্য হয়েছেন বলেও জানা যায়। 

সিআইডি জানিয়েছে, গত দেড় বছরে হরিদাসের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা এবং সমপরিমাণ টাকা উত্তোলনের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। যার কোনো বৈধ উৎস নেই। ১২ জুলাই পলাশবাড়ীর মন্দির এলাকা থেকে সিআইডির একটি বিশেষ দল হরিদাসকে আটক করে। পরে উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। সোমবার আদালতের মাধ্যমে তাকে চার দিনের রিমান্ডে নেয় সংস্থাটি। 

সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, অস্বাভাবিক অর্থ লেনদেনের বিষয়ে হরিদাস দাবি করেছেন, তার ভক্তরা তাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে নানা ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। 

তদন্তকারীদের মতে, একজন এসি মেকানিক থেকে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে শতকোটি টাকা লেনদেনের উৎসের পেছনে কী রয়েছে, তার ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে।