দরিদ্র ও ভাসমান মানুষের জীবনমান উন্নয়নের নামে প্রায় ৬১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল সমাজসেবা অধিদপ্তর। কিন্তু প্রকৃত সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশের কিছু বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নেওয়া দরিদ্র ও ভাসমান মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রায় ৬১ কোটি টাকার প্রকল্পটি প্রস্তাব করে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
গত ৫ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় পরামর্শক নিয়োগ, বিদেশভ্রমণ, অফিসভাড়া, ব্যবস্থাপনা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কমিশনের কর্মকর্তারা। কিন্তু সমাজসেবা অধিদপ্তর ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, অনুদানের প্রকল্প হলেও এর ৮০ শতাংশের বেশি অর্থ বাস্তবায়নকারী সংস্থা জিআইজেডের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। ফলে দেশের প্রকৃত সুবিধাভোগীরা খুব সামান্যই উপকৃত হতেন। পরামর্শক, বিদেশভ্রমণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের অস্বাভাবিক প্রস্তাব থাকায় কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়নি।
প্রকল্পের নথির তথ্য অনুযায়ী, মোট বাজেটের মধ্যে মাত্র আট কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা মোট ব্যয়ের মাত্র ১৩.২৩ শতাংশ। এই অর্থ দিয়ে ২৭০ জন নারী, ৩০ জন প্রতিবন্ধীসহ মোট ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি শিশুযত্ন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং নারীবান্ধব ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সামাজিক সেবার মাধ্যমে আরো দেড় হাজার মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
অন্যদিকে প্রকল্পের বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করার প্রস্তাব ছিল বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা খাতে। শুধু দেশি-বিদেশি ৪৭৩ জন পরামর্শক নিয়োগেই ব্যয় ধরা হয় ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৪৮.৩৩ শতাংশ। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে রাখা হয় ১০ কোটি সাত লাখ ৬৫ হাজার টাকা, অফিসভাড়ার জন্য তিন কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং দেশি-বিদেশি ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় চার কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
প্রকল্পে বিদেশভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য সাড়ে তিন কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনা এবং বিদেশ সফরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও এমন ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে আপত্তি জানায় পরিকল্পনা কমিশন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় বিদেশ সফরের লোভনীয় সুযোগ দেখিয়ে এ ধরনের প্রকল্প সহজে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের সুযোগ দিলেই তাঁরা সন্তুষ্ট হন, এরপর দরিদ্র মানুষের নামে নেওয়া প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয়ে শেষ হয়ে যায়।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প প্রস্তাবে সুবিধাভোগী নির্বাচনপ্রক্রিয়া স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদের একটি অংশ এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হওয়ায় বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের দায় নিতে নারাজ সমাজসেবা অধিদপ্তর। সংস্থাটির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এটি মূলত একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে জিআইজেডের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং প্রকল্পের কাঠামোও মূলত দাতা সংস্থাই প্রস্তুত করেছে। অনুদানের প্রকল্প হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই দাতা সংস্থার শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে কিছু প্রশাসনিক ব্যয় থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ব্যয় কখনোই এমন পর্যায়ে যেতে পারে না, যেখানে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই আড়ালে পড়ে যায়। বিশেষ করে দরিদ্র, বাস্তুচ্যুত ও জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার মানুষের জন্য নেওয়া প্রকল্পে অর্থের বড় অংশ সরাসরি তাদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হওয়াই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। সেখানে যদি বেশির অর্থ পরামর্শক, বিদেশভ্রমণ, অফিস পরিচালনা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় চলে যায়, তাহলে প্রকল্পের সামাজিক প্রভাব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে সাবেক পরিকল্পনা বিভাগের সচিব মামুন আল রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সুবিধাভোগীদের নামে নেওয়া প্রকল্পের অর্থ যদি শেষ পর্যন্ত পরামর্শক, বিদেশভ্রমণ ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে জনগণের কাছে এমন প্রকল্পের কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। মানুষ মনে করবে, তাদের নামে প্রকল্প নেওয়া হলেও প্রকৃত সুবিধা পাচ্ছে অন্য কেউ। কাগজে-কলমে যদি ১০ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়, অথচ বাস্তবে সুবিধাভোগী তিন টাকাও না পায়, তাহলে সেই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়।
তাঁর মতে, প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিকল্পনা কমিশনের আরো কঠোরভাবে ব্যয় কাঠামো যাচাই করা উচিত, যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরাই সর্বোচ্চ উপকার পায় এবং কোনো অবস্থায়ই প্রশাসনিক ব্যয় প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যেতে না পারে।