Image description

হবিগঞ্জে হামের সংক্রমণ যখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে, তখন স্থবির হয়ে পড়েছে শিশুদের নিয়মিত হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কার্যক্রম। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, হামে আক্রান্ত হয়ে জেলায় এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে আট শিশুর। যাদের অধিকাংশই জন্মের পর নির্ধারিত সময়ে পায়নি এমআর টিকার দুই ডোজ। শুধু তাই নয়, একই বয়সী আরও প্রায় ১ হাজার ৯০০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে হাসপাতালে।

সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যু এড়ানো সম্ভব। হামে শিশুমৃত্যুর পেছনে শুধু একটি কারণ নয়; দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট, সম্প্রতি স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি এবং সচেতনতার ঘাটতি মিলেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে— মনে করেন চিকিৎসকরা।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, হবিগঞ্জের ৭৮টি ইউনিয়নে রয়েছে ২ হাজার ১৬টি ইপিআই টিকাদান কেন্দ্র। অথচ এসব কেন্দ্র পরিচালনার জন্য মাঠপর্যায়ে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা মাত্র ১৬১। অর্থাৎ একজন স্বাস্থ্যকর্মীকেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে গড়ে ১২টির বেশি কেন্দ্রের। জনবল সংকটের মধ্যেই স্বাস্থ্যকর্মীদের দুই দফা কর্মবিরতির প্রভাব পড়েছে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে। ফলে নির্ধারিত সময়ে অনেক শিশু বঞ্চিত হয়েছে এমআর টিকা থেকে।

শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই সংকটের বাস্তব প্রভাব। মাধবপুর উপজেলার শাহপুর হরিতলা গ্রামের দেড় বছরের শিশু খাদিজা আক্তার জন্মের পর পায়নি এমআর টিকা। কিছুদিন আগে অগ্নিদগ্ধ হয়ে হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল সে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সুস্থ হয়ে বাড়িও ফেরে শিশুটি। কিন্তু পরদিন শরীরে র‌্যাশ দেখা দিলে আবার ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। পরীক্ষায় তার হাম শনাক্ত হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। এ বিষয়টি তখন নিশ্চিত করেছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইমরুল হাসান।

খাদিজাই একমাত্র নয়; জেলার বিভিন্ন উপজেলার চিত্র পাওয়া গেছে একই ধরনের। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে রয়েছে বানিয়াচং উপজেলার চমকপুর গ্রামের আবু হুরায়রা (৯ মাস), নবীগঞ্জ উপজেলার কাকুড়া গ্রামের সাইফান আহমদ (৯ মাস), একই উপজেলার কানাইপুর গ্রামের রায়হান আহমদ (৮ মাস), বাহুবল উপজেলার বশিনা গ্রামের একরামুল (৯ মাস) এবং মিরপুর এলাকার আবুল খায়ের (দেড় বছর)।

স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তে দেখা গেছে, তাদের অধিকাংশই নির্ধারিত সময়ে এমআর টিকা পায়নি। অনেকের ক্ষেত্রে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যাওয়ার পর ধরা পড়ে হামের সংক্রমণ।

রায়হানের পরিবার জানায়, ঠান্ডা-জ্বর নিয়ে রায়হানকে প্রথমে নেওয়া হয়েছিল নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় সিলেটে।

 

নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আব্দুস সামাদের ভাষায়, প্রথমে নিউমোনিয়া থাকলেও পরে শরীর জুড়ে র‌্যাশসহ দেখা দেয় হামের উপসর্গ। শেষ পর্যন্ত শিশুটির মৃত্যু হয়।

জাতীয় টিকাদান সূচি অনুযায়ী, শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে এমআর টিকার দুই ডোজ নেওয়ার কথা। এই দুই ডোজ শেষ হলে প্রায় ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ শিশু হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায়। অথচ চলমান প্রাদুর্ভাবের সময়ই বহু শিশু নির্ধারিত টিকা পায়নি। ফলে বেড়ে গেছে সংক্রমণ, জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হবিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৯-১৫ মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার ৮৩১। স্বাস্থ্য বিভাগের ইপিআই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি। সেই হিসাবে নিয়মিত টিকার আওতায় থাকার কথা বিপুলসংখ্যক শিশুর। কিন্তু মাঠপর্যায়ে জনবল সংকটের কারণে তাদের অনেকেই সময়মতো টিকা পাচ্ছে না— জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এই সংকটের কথা স্বীকার করেছে স্বাস্থ্য বিভাগও। হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. রতদ্বীপ বিশ্বাস বলেছেন, ‘শতভাগ শিশু টিকার আওতায় এলে হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়।’

তার ভাষ্য, স্বল্প জনবলের কারণে আইপিসি কার্যক্রম ব্যাহত হলেও নিয়মিত কেন্দ্র পরিদর্শনের মাধ্যমে চেষ্টা চলছে টিকাদান ত্বরান্বিত করার। ২০২৫ সাল এবং চলতি বছরে দুই দফা কর্মবিরতির সময়ও ইউনিসেফের সহায়তায় টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সংকট নেই টিকার।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো হারিয়ে যাওয়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা। ‘কোনো টিকাই শতভাগ সুরক্ষা দেয় না। তবে নির্ধারিত সময়ে এমআর টিকার দুই ডোজ শেষ করলে ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ শিশু হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পায়। ফলে সংক্রমণ, জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়’— বললেন চিকিৎসক মুকুট রায়। তার মতে, চলমান প্রাদুর্ভাবের মধ্যে নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা, মাঠপর্যায়ে জনবল বাড়ানো এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি— এই তিনটি পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে জরুরি।