ঝালকাঠিতে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় কারাগারে যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন শামীম (৪০)। তাকে নির্দোষ দাবি করে জামিনের পক্ষে আদালতে হলফনামা দাখিল করেছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ২০ নেতা। গতকাল বুধবার ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিন শুনানির সময় বিষয়টি সামনে আসে।
এ ঘটনায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. মতিয়ার রহমান তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং শুনানিকালে শামীমের আইনজীবী ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মিজানুর রহমান মুবিনকে ভর্ত্সনা করেন।
জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মাহেব হোসেন জামিন শুনানির সময় হলফনামা দাখিল এবং একজন আইনজীবীকে ভর্ত্সনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ঘটনাটি আদালতপাড়া ও শহরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
পুলিশের প্রতিবেদনে জাকির হোসেন শামীমকে ঝালকাঠি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ক্যাডার দাবি করা হয়েছে। তবে হলফনামায় স্বাক্ষরকারী বিএনপি নেতারা দাবি করেছেন, তিনি মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, জেলা বিএনপি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ছাত্রদল নেতা সুমন মণ্ডল বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি করেন। মামলায় জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক রেজাউল করিম জাকির, যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল শরীফ, আওয়ামী লীগ নেতা তরুণ কর্মকারসহ ১৪৬ জনকে আসামি করা হয়। পরে গত ১৬ জুন ঝালকাঠি থানা পুলিশ ওই মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে জাকির হোসেন শামীমকে গ্রেপ্তার করে।
আদালতে দাখিল করা হলফনামায় বিএনপি নেতারা উল্লেখ করেন, তারা সবাই মামলার সাক্ষী এবং তাদের জানা মতে জাকির হোসেন শামীম ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তারা দাবি করেন, হামলার সময় তাকে ঘটনাস্থল বা আশপাশে কেউ দেখেননি, সিসিটিভি ফুটেজেও তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি এবং বাদীকেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তারা কোনো তথ্য দেননি। তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ বা জিজ্ঞাসাবাদ না করেই তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন বলেও হলফনামায় অভিযোগ করা হয়। শামীমকে হয়রানি না করার স্বার্থে তারা স্বেচ্ছায় এই হলফনামা দিয়েছেন বলে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
হলফনামায় আরও বলা হয়, শামীমের বাবা সুলতান হোসেন খান ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ছোট ভাই শাহীন খান পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং মা খাদিজা বেগম পৌর মহিলা দলের সাবেক সভাপতি। সেখানে দাবি করা হয়, শামীম বর্তমানে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী এবং সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। একই সঙ্গে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত।
হলফনামায় স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম এজাজ হাসান, সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন খোকন, সহসভাপতি আনিচুজ্জামান চপল, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ জিয়াউল ইসলাম, সৈয়দ রেজাউল করিম, পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাসিমুল হাসান, জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মুবিন, অ্যাডভোকেট মু. শামীম আলম, অ্যাডভোকেট আল আমিন, সরদার সাফায়াত হোসেন, তাঁতীদলের সভাপতি মো. বাচ্চু হাসান, যুবদল নেতা সেলিম হাসান, মো. সাজিব হোসেন, রুবেল ফকির, মো. নাজমুল মিরাজ, হেমায়েত হোসেন মল্লিক, ফারজানা ইয়াসমিন, মো. তৌহিদ হোসেন, ইয়াসির আরাফাত মিঠু ও লাভলী বেগম।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. এজাজ হাসান বললেন, ‘আসলে আমার বক্তব্য তো আর মোবাইলে বলা যায় না। আমরা বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার মধ্যেই ছিলাম বিগত দিনে। অনেক হলফনামাতেই আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে স্বাক্ষর করেছি। কোনটা কিভাবে হয়েছে সেটা তো আর জানি না। আমি যে স্বাক্ষর দিইনি সেটা তো না। অনেক জায়গায় স্বাক্ষর দিয়েছি। যুবলীগ বা সুনির্দিষ্টভাবে কারও পক্ষে কাজ করা বা কারও পক্ষে স্বাক্ষর দেওয়া দলের সভাপতি হিসেবে আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না। আমরা বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামের সময় হলফনামায়, এমনকি কোর্টের ইস্যুতেও স্বাক্ষর দিয়েছি। কিন্তু যুবলীগের প্রশ্নে বা কারও সঙ্গে আঁতাত কিংবা কোনো যোগসূত্রের সঙ্গে আমার সখ্যতা নেই। আমার আগের রেকর্ড দেখেন। আমি দল করি এবং দলের স্বার্থে যা যা করণীয় সেটাই করব ইনশাআল্লাহ।’
অন্যদিকে পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাসিমুল হাসান দাবি করেন, ‘ওই স্বাক্ষর আমার না। আমি আজ বিকালে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবকে জানাব যে এই সই কে করেছে এবং কোথা থেকে এই সই এসেছে, তা যাচাই করা হোক।’