Image description

বহুতল ভবনের সংখ্যা দেশে বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। সেই সঙ্গে একসময়ের বিলাসী অনুষঙ্গ থেকে নিত্যদিনের অপরিহার্য বাহনে পরিণত হয়েছে লিফট বা এলিভেটর। কিন্তু এই যান্ত্রিক বাহনটির পেছনেই লুকিয়ে চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা। সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর লোভ, অদক্ষ হাতের কারিগরি আর মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রের ব্যবহার লিফটকে বানিয়ে তুলেছে বহুতল ভবনগুলোর একেকটি চলন্ত মৃত্যুকূপ। নিয়মিত দেখভালে অনীহা আর সস্তার খেসারত সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে নিজেদের জীবন দিয়ে। পাশাপাশি পঙ্গুও হচ্ছেন বহু মানুষ।

বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের মতে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ লিফটের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা বা আয়ুষ্কাল ২০ থেকে ২৫ বছর। কিন্তু দেশের শত শত ভবনে এই সময়সীমা পার হওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে চালানো হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ লিফট।

অনেকে আবার লিফট কেনার সময় সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে বাজার থেকে বেছে নিচ্ছেন নিম্নমানের ও নামহীন ব্র্যান্ডের লিফট। শুধু তাই নয়, কোনো পেশাদার প্রকৌশলীর পরামর্শ ছাড়াই সম্পূর্ণ অদক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে এসব লিফট করা হচ্ছে স্থাপন। ফলে ভবনের শুরু থেকেই থেকে যাচ্ছে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি।
লিফট স্থাপনের পর প্রয়োজন সেটির নিয়মিত তদারকি। কিন্তু দেশের অধিকাংশ ভবনেই করা হয় না লিফটের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষণাবেক্ষণ বা ‘মেনটেইন্যান্স’। অদক্ষ লোক দিয়ে দায়সারাভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত চারটি বড় গাফিলতির কারণে লিফটগুলো পরিণত হচ্ছে একেকটি সচল মৃত্যুকূপে। যার মধ্যে অন্যতম হলো তদারকির অভাব। মাসে অন্তত একবার নিয়মিত তদারকি এবং বছরে একবার সব যন্ত্রাংশ পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না। দুর্ঘটনার আরেকটি অন্যতম কারণ অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস (ARD) না থাকা। বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট যেন মাঝপথে আটকে না যায়, সে জন্য এই যন্ত্রটি জরুরি। কিন্তু সস্তার লিফটে এটি থাকে না। দুর্ঘটনায় হতাহত বাড়তে ভূমিকা রাখে অকেজো অ্যালার্ম ও ফ্যান। লিফট আটকে গেলে ভেতরে বাতাস চলাচলের ফ্যান এবং জরুরি যোগাযোগের অ্যালার্ম বাটন নষ্ট থাকে বেশিরভাগ সময়ই। এতে ভেতরে থাকা মানুষ প্যানিক অ্যাটাক বা অক্সিজেনের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। মারাও যান অনেকে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠাও লিফটকে ঠেলে দেয় দুর্ঘটনার মুখে। লিফটের ধারণক্ষমতা বা সক্ষমতা না মেনে গাদাগাদি করে মানুষ ওঠানোও ডেকে আনে দুর্ঘটনা।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ছয় বছরে দেশে ঘটেছে ৮৮৭টি লিফট দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৯০০ জন।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে ২০২৪ সালে। ওই এক বছরেই নিহত হন ছয়জন এবং আহত হন প্রায় ২০০ মানুষ। তার আগের বছর ২০২৩ সালে ১৭৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৯ জন।
২০১৯ সাল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের বার্ষিক প্রতিবেদনে লিফট দুর্ঘটনাকে আলাদা কোড না দিয়ে ‘ভবনে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার’ হিসেবে একসঙ্গে গণনা করা হতো, যে কারণে তার আগের বছরগুলোর লিফট দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্ভব হয়নি জানা। তা ছাড়া ফায়ার সার্ভিস কেবল সেই তথ্যই রাখে, যেখানে তাদের উদ্ধারকারী দল সরাসরি অংশ নেয় বা কল পায়। এর বাইরেও শত শত দুর্ঘটনার তথ্য থেকে যায় আড়ালেই।

সবচেয়ে বেশি লিফট দুর্ঘটনা ঘটছে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালগুলোতে, যেখানে সাধারণ মানুষের যাতায়াত সবচেয়ে বেশি। সুস্থ হতে আসা রোগী কিংবা সেবাপ্রার্থী সাধারণ মানুষ এসব ভবনে ঢুকেই শিকার হচ্ছেন চরম আতঙ্কময় পরিস্থিতির।

২০১৬ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমসহ সাতজন এবং ২০২৪ সালের মার্চে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেনসহ ১৫ জন যথাক্রমে সচিবালয় ও হাসপাতালের লিফটে আটকে পড়ে ভোগান্তির শিকার হন। হাসপাতালে লিফট দুর্ঘটনায় ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও। ২০২৪ সালের মে মাসে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নির্ধারিত তলার আগেই খুলে যায় দরজা। ১২ তলার ফাঁকা অংশ দিয়ে নিচে পড়ে মারা যান জিল্লুর রহমান নামের এক রোগী। মাত্র আট দিন পর একই হাসপাতালের লিফটে ৪৫ মিনিট আটকে থেকে অক্সিজেনের অভাবে মারা যান মমতাজ বেগম নামে আরেক রোগী।

তার ছিঁড়ে ও লক হয়েও ঘটছে দুর্ঘটনা। ২০২৩ সালে মানিকগঞ্জের সেন্ট্রাল স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং শেরপুর সদর হাসপাতালে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী ওঠায় লিফটের তার ছিঁড়ে ও লক হয়ে গুরুতর আহত হন বহু মানুষ।
দুর্ঘটনার তালিকায় বাদ নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনও। গত বছরের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের লিফটে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আধা ঘণ্টা আটকে থাকেন ২৬ শিক্ষার্থী। বদ্ধ পরিবেশে আতঙ্কে চেতনা হারান এক ছাত্রী। তার আগের বছরের অক্টোবরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সিএআরএস ভবনে লিফট দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় এক কর্মকর্তার। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুন্সী মেহেরুল্লাহ হলে এ বছরের মে মাসে লিফটে আটকে শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন ১১ শিক্ষার্থী।

২০১৬ সালে উত্তরার আলাউদ্দীন টাওয়ারের লিফট বেজমেন্টে আছড়ে পড়ে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে, এতে নিহত হন ছয়জন। ২০২০ সালে উত্তরায় লিফট না আসতেই দরজা খুলে যাওয়ায় পাঁচতলা থেকে নিচে পড়ে মৃত্যু হয় এক নারীর। তার আগে ২০১৮ সালের মার্চে রাজধানীর চামেলীবাগে আবাসিক ভবনের লিফটে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ওঠার সময় সেন্সর কাজ না করায় সজোরে দরজা বন্ধ হয়ে গেলে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যায় ৯ বছরের এক শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিফট নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হলে সিংহভাগ দুর্ঘটনাই সম্ভব এড়ানো। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় অবহেলার প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিন্মমানের লিফট ব্যবহার বন্ধে সরকারের কঠোরতা এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসান মোহাম্মদ মোস্তফা আফরোজ জানালেন, ভালোমানের আধুনিক লিফটে থাকে বিভিন্ন ধরনের একাধিক বিকল্প নিরাপত্তা সরঞ্জাম। যার ফলে সহজেই এড়ানো যায় দুর্ঘটনা। তিনি বললেন, ‘কোনো কারণে একটাতে সমস্যা হলে অন্যটার মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া হয়। ফলে হরহামেশা লিফট আটকে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো ধরনের দুর্ঘটনার সুযোগ খুবই কম। এ কারণে জাপান, সিঙ্গাপুর কিংবা উন্নত দেশগুলোতে লিফট দুর্ঘটনার কথা তেমন একটা শোনা যায় না।’

‘কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই এ দুর্ঘটনা ঘটে। কারণ, এসব লিফট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিম্নমানের যন্ত্রপাতিও ব্যবহার করা হয়, যা খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি খুবই সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত। এটি নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে হাসপাতাল ও জনগুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের আরও বেশি সতর্ক হওয়া দরকার’— যোগ করলেন যন্ত্রকৌশলের এই অধ্যাপক।

নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে আগামীর সময়কে বললেন, “আমাদের যে লিফট, সেগুলো প্রতি মাসে অন্তত একবার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি বছরে একবার সব যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করা হয়। প্রায় ৪০টির মতো ‘চেকলিস্ট’ তৈরি করা আছে। যেগুলো প্রতিটি ধরে ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় লিফট দুর্ঘটনা এড়াতে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতেও যদি এভাবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়, তাহলে এ নিয়ে আর উদ্বেগ থাকবে না।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের মতে, হাসপাতালের লিফট সাধারণ শপিংমল বা আবাসিক ভবনের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। সেখানে ওঠাতে হয় হুইলচেয়ার ও স্ট্রেচার। যে কারণে প্রতি লিফটে সার্বক্ষণিক দক্ষ অপারেটর থাকা বাধ্যতামূলক। তা না হলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের যান্ত্রিক বিপর্যয় বা অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

দেশে পেশাজীবী প্রকৌশলীদের একমাত্র সংস্থা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)। প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী কে এম আসাদুজ্জামান সনিক এলিভেটর লিমিটেডেরও চেয়ারম্যান। জানালেন, দেশে মেয়াদোত্তীর্ণের পরও বহু লিফট ব্যবহার হচ্ছে বছরের পর বছর। আবার সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে নিম্নমানের লিফট ব্যবহার করেন কেউ কেউ। এ ছাড়া বেশিরভাগ লিফটই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। কখনো কখনো আবার পেশাদার প্রকৌশলীদের পরামর্শ ছাড়াই অদক্ষদের দিয়ে লিফট স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণ হয় দায়সারাভাবে। এতে করে বাড়ছে দুর্ঘটনা।

এ বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার তাগাদা দিয়ে প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘অনেক লিফটে আবার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠেন, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই যাত্রীদেরও সচেতন হওয়া দরকার। তবে কোনো কারণে লিফট আটকে গেলে আতঙ্কিত হয়ে কান্নাকাটি, দরজা ঝাঁকাঝাঁকি করলে বিপদ আরও বাড়তে পারে; বরং শান্ত হয়ে অপেক্ষা করতে হবে। ভারতের একটি হাসপাতালে দুদিন পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় এক ব্যক্তির লিফটে আটকে থাকার নজির রয়েছে। তাই অস্থির না হয়ে সাহায্যের জন্য অ্যালার্ম বাটন চাপা, পরিচিতজন কিংবা ৯৯৯-এ কল করার চেষ্টা করতে হবে।’